কর কমিশনার আবদুর রকিবের  বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) সাবেক মহাপরিচালক এবং বর্তমানে ঢাকা কর অঞ্চল-৮-এর কর কমিশনার মোহাম্মদ আবদুর রকিবের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি রাজস্ব ক্ষতি, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের হস্তক্ষেপ চেয়ে গত ৩০ আগস্ট ২০২৬ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের পক্ষে ব্যারিস্টার রুকন উদ্দিন আহমেদ লিখিত আবেদন করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আবদুর রকিবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি রাজস্ব ক্ষতি এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তুলে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাধারণ শাখা থেকে উপসচিব তানিয়া আফরোজ স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে আবদুর রকিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিবকে নির্দেশনার অনুলিপি পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে।

প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ

অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহমানের ‘পালিত পুত্র’ হিসেবে আবদুর রকিব নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এর মাধ্যমে এনবিআরের ওপর মহলে প্রভাব তৈরি করে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়। ওই প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও আনা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা অভিযোগপত্রে উল্লেখ নেই। অভিযোগগুলোর বিষয়ে যথাযথ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

নির্বাচন সামনে রেখে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ

অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আবদুর রকিব সরকারের ঘনিষ্ঠ ‘ডোনার’ ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০২৩ সালে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঘুষের মাধ্যমে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে তৎকালীন আওয়ামী লীগকে সহযোগিতা করার অভিযোগও আনা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিজেকে আড়াল করতে আবদুর রকিব দাড়ি রাখা, টুপি ও পাঞ্জাবি পরা এবং জামায়াতের আমিরের ঘনিষ্ঠ হওয়ার অভিনয় শুরু করেন।

বড় শিল্পগোষ্ঠীর ফাইল আটকে অর্থ দাবির অভিযোগ

অভিযোগপত্রের তথ্যানুযায়ী, কর কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আবদুর রকিব দেশের কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর ফাইল আটকে রেখে অর্থ দাবি করতেন। আকিজ গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও মীর গ্রুপের ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা দাবি করার অভিযোগ করা হয়েছে।

একইভাবে হা-মীম গ্রুপ তার দাবিকৃত ১০০ কোটি টাকা ঘুষ দিতে রাজি না হওয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি সাধন করা হয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়।

এ ছাড়া ইউনাইটেড গ্রুপ থেকে ১ কোটি টাকা, এস আলম গ্রুপ থেকে ১০০ কোটি টাকা এবং অগ্রিম রাজস্বের নামে ৩৫০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সরকারের শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

৩২৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

এনবিআরে দায়িত্ব পালনকালে কোনো অফিসিয়াল রেকর্ড না রেখে নগদ অর্থের বিনিময়ে ৩০টি ফাইলে স্বাক্ষর করার অভিযোগও রয়েছে আবদুর রকিবের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে একজন ডিসির সঙ্গে যোগসাজশ করে ৩২৪ কোটি টাকা আত্মসাতের সঙ্গেও তার সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই প্রয়োজন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখিত দাবিগুলোর ধরন থেকে প্রতীয়মান হয়।

নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদের অভিযোগ

অভিযোগপত্রে আবদুর রকিব এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজধানীর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর রোডে তার নামে ১০ কাঠার একটি প্লট রয়েছে। কলাবাগান লেক সার্কাস এলাকায় ৫ হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য ১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া গুলশান-২-এর ২৭/সি নম্বর রোডে একটি ফ্ল্যাট এবং সাভারে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ২০ কাঠার একটি প্লট থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।

২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে গ্রামের বাড়িতে শত শত বিঘা জমি কেনার অভিযোগও রয়েছে।

স্ত্রীর নামে এফডিআর ও ফ্ল্যাটের অভিযোগ

অভিযোগপত্রে আবদুর রকিবের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিনের নামেও বিভিন্ন সম্পদের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় তার নামে ১০ কোটি টাকা এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ২০ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে।

এ ছাড়া শ্যামলীতে ৩ হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, বনানী ১১ নম্বর রোডের ৬৭ নম্বর বাড়িতে ৩ হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট এবং ২০২২ সালে ইস্টার্ন হাউজিং প্রকল্পে ১০ কাঠার প্লট কেনার অভিযোগও করা হয়েছে।

কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় অর্থ পাচারের অভিযোগ

অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, কানাডায় বসবাসরত বড় ছেলে আফজালের পড়াশোনার খরচ বাবদ ৫০ লাখ টাকা পাঠানোর পাশাপাশি হুন্ডির মাধ্যমে ১০ কোটি টাকা পাচার করে টরন্টোতে একটি বাড়ি কেনা হয়েছে।

ছোট ছেলে সোহেল রানার নামে যমুনা ব্যাংকের গুলশান শাখায় ৫ কোটি টাকার এফডিআর থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে তার নামে একটি বিলাসবহুল গাড়ি, ফ্ল্যাট ও পেট্রোল পাম্প থাকার দাবিও করা হয়েছে।

অন্যদিকে ছোট মেয়ে লুবনা খাতুনের নামে গুলশান-২-এর ১৭ নম্বর রোডের ৫৩১ নম্বর বাড়ির ৬/বি নম্বরে ৩ হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট এবং অপর মেয়ে আয়েশা আক্তার ঝুমুরের নামে প্রিমিয়ার ব্যাংকের বনানী শাখায় ২ কোটি টাকার এফডিআর থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, ঝুমুরের বিয়েতে একটি হোটেল ভাড়া করে এক রাতে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল।

‘এক টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণ হলে শাস্তি মেনে নেব’

অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদ আবদুর রকিব।

তিনি বলেন, এনবিআরের যেকোনো পর্যায়ের কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেও কেউ তার বিরুদ্ধে এক টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবেন না। কোনো ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এক টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও প্রমাণ করা গেলে তিনি যেকোনো শাস্তি মেনে নিতে প্রস্তুত বলে দাবি করেন।

অর্থাৎ অভিযোগপত্রে উত্থাপিত বিপুল অঙ্কের ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগের সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্যের সরাসরি বিরোধ রয়েছে।

সিআইসি থেকে ঢাকা কর অঞ্চল-৮-এ বদলি

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২০ আগস্ট এনবিআরের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) আহসান হাবীব কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের মহাপরিচালকের পদ থেকে মোহাম্মদ আবদুর রকিবকে সরিয়ে ঢাকা কর অঞ্চল-৮-এর কর কমিশনার হিসেবে বদলি করেন। এনবিআরের প্রকাশিত ২০ আগস্টের নথির তালিকাতেও কর কমিশনার পর্যায়ের বদলি/পদায়ন সংক্রান্ত আদেশ রয়েছে।

এদিকে, অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা, সম্পদের প্রকৃত উৎস, সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন এবং সরকারি রাজস্ব ক্ষতির বিষয়গুলো স্পষ্ট হতে পারে বলে অভিযোগকারীরা মনে করছেন। বর্তমানে অভিযোগগুলো তদন্ত ও যাচাইয়ের বিষয় হিসেবে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *