কাস্টমস কর্মকর্তা কাজিয়া সুলতানা দম্পতির ‘সম্পদের পাহাড়’, উঠছে দুর্নীতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিনিধি: বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ক্যাডারের কর্মকর্তা কাজিয়া সুলতানার (পরিচিতি নম্বর-৩০০২৮৫) সম্প্রতি যুগ্ম কমিশনার (গ্রেড-৫) পদে পদোন্নতি এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে পদায়ন ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তার ও তার স্বামী শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা মহিউদ্দীন আহমেদ মুরাদের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে।

বিভিন্ন অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই দম্পতির নামে ফ্ল্যাট, প্লট, বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক স্পেস, জমি ও ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব সম্পদের সঙ্গে তাদের বৈধ আয় ও ঘোষিত সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানী তথ্যে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আফতাবনগরের জহুরুল ইসলাম সিটির এফ ব্লকের সেক্টর-১, রোড-৩-এর ১৯ নম্বর বাড়িতে তিন কাঠার একটি প্লট মহিউদ্দীন আহমেদের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। দলিলে প্লটটির মূল্য ১৭ লাখ ২৬ হাজার টাকা দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকায় কেনা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই জমিতে আনুমানিক ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে আটতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। ভবনটি থেকে প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ভাড়া আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এ ছাড়া রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ২ হাজার ৪০০ বর্গফুটের একাধিক ফ্ল্যাট এই দম্পতির রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই এলাকার এল ব্লকে তাদের ১২ কাঠার একটি প্লট রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, ওই জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। সেখানে একটি বাগানবাড়িও গড়ে তোলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানী তথ্যে আরও বলা হয়েছে, উত্তর বাড্ডার বিটিআই শপিংমলে ‘স্টাইল এমকে’ নামে দুটি দোকান রয়েছে দম্পতির। এসব দোকান আনুমানিক ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে সাড়ে চার কাঠা জমি, একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ি এবং গ্রামের বাড়িতে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ডুপ্লেক্স বাড়ির তথ্যও উঠে এসেছে। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে কাজিয়া সুলতানা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব পদায়ন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এনবিআরের সাবেক সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেনের প্রভাবের কারণে তিনি দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে এ অভিযোগের স্বপক্ষে সংশ্লিষ্ট কোনো নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া আইসিডি কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। এর ফলে সমসাময়িক কর্মকর্তাদের তুলনায় তার পদোন্নতি বিলম্বিত হয় বলে সূত্রের দাবি। পরবর্তীতে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট ও ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনের সময় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও ওঠে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিভিন্ন সময়ে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরও গত ২২ জুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কাজিয়া সুলতানাকে বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ক্যাডারের যুগ্ম কমিশনার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে এনবিআরের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে কাজিয়া সুলতানা ও তার স্বামী মহিউদ্দীন আহমেদ মুরাদের বক্তব্য জানতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুল্ক ও কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়মুক্ত করার মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য সামনে আনা সম্ভব। তাই দম্পতির নামে থাকা সম্পদ, সম্পদের উৎস এবং তাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করে দেখার দাবি উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *