কাজী দেলোয়ার হোসেন:
গাজীপুরের চন্দ্রা বিট অফিসে কর্মরত এক বন প্রহরীর বিপুল সম্পদ অর্জন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রায় ৩৫ হাজার টাকা মাসিক বেতনে চাকরি করেও কীভাবে তিনি কোটি টাকা মূল্যের জমি কিনে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই বন প্রহরী মো. এনামুল হক হরতকীতলা মৌজার ২৮ নম্বর দাগে ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ জমি কিনেছেন। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে ওই জমির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। শুধু জমি কেনার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ নয়; সেখানে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে পরিবারের সদস্যদের ঢাকায় ব্যয়বহুল বাসায় রেখে ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ানোর বিষয়টিও স্থানীয়দের নজরে এসেছে। এ নিয়ে তাদের প্রশ্ন, সরকারি চাকরিতে মাসে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা বেতন পাওয়া একজন বন প্রহরীর আয় ও সম্পদের মধ্যে এত বড় পার্থক্যের কারণ কী?
বনভূমি দখল ও গাছ বিক্রির অভিযোগ
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ওই বন প্রহরী চাকরির প্রভাব কাজে লাগিয়ে বন বিভাগের জমিতে অর্থের বিনিময়ে ঘরবাড়ি নির্মাণের সুযোগ করে দিচ্ছেন। একই সঙ্গে বনাঞ্চলের বিভিন্ন গাছ একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বন প্রহরীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, “বনের জমি রক্ষার দায়িত্ব যাদের ওপর, তাদের কারও বিরুদ্ধে যদি বনভূমি দখল ও গাছ বিক্রির অভিযোগ ওঠে, তাহলে বন রক্ষা করবে কে? বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।”
সংগ্রাম থেকে আর্থিক পরিবর্তন
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছোটবেলায় মো. এনামুল হকের মা মারা যান এবং তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর লজিংয়ে থেকে লেখাপড়া করতে হয়েছে তাকে। পরবর্তীতে বন বিভাগে চাকরি পাওয়ার পর তার আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে বলে স্থানীয়দের দাবি।
তবে তার বর্তমান সম্পদের উৎস কী এবং এসব সম্পদ বৈধ আয়ের মাধ্যমে অর্জিত কি না—এ বিষয়ে সরকারি কোনো যাচাই বা তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
কমছে বনভূমি, বাড়ছে স্থাপনা
সরেজমিনে দেখা গেছে, গাজীপুরের বিভিন্ন বনাঞ্চলে টিনশেড ঘর থেকে শুরু করে বহুতল ভবন পর্যন্ত নানা ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও বনভূমির জায়গা দখল করে বসতি গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বনভূমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী বনাঞ্চল দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়বে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়বে।
সচেতন মহলের মতে, বনভূমি রক্ষায় দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয় ও সম্পদের সামঞ্জস্য খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন বিভাগের জমিতে কীভাবে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, কারা এসব স্থাপনার অনুমতি দিচ্ছে এবং গাছ কাটার অভিযোগের সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
এলাকাবাসীর দাবি, বন প্রহরী মো. এনামুল হকের বিপুল সম্পদ অর্জন, বনভূমিতে স্থাপনা নির্মাণে সহযোগিতা এবং গাছ বিক্রির অভিযোগসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের আরও দাবি, শুধু কোনো একজন কর্মচারী নয়, বনভূমি দখল ও বন উজাড়ের সঙ্গে জড়িত পুরো চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে অব্যাহত বনভূমি দখল, অবৈধ স্থাপনা ও গাছ নিধনের কারণে গাজীপুরের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।