ক্রসফায়ার বিতর্কে আইজিপির বক্তব্যের পক্ষে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন

নিজস্ব প্রতিবেদক:

‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যকে সময়োপযোগী আহ্বান হিসেবে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএ)। সংগঠনটির দাবি, প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের আলোকে আইজিপির বক্তব্য বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পুলিশ সদস্যদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের স্বাক্ষর করা এক বিবৃতিতে এ অবস্থান জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের পরিবর্তিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মব কালচার এবং ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আইজিপির বক্তব্যকে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ এবং পুলিশ সদস্যদের পেশাগত আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর আহ্বান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন জানায়, সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুসরণ করেই বাংলাদেশ পুলিশ কার্যক্রম পরিচালনা করে। দণ্ডবিধি, ১৮৬০; ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮; পুলিশ আইন, ১৮৬১ এবং পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গলসহ বিভিন্ন আইনে পুলিশের ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব বিধান প্রয়োগের পাশাপাশি মানবাধিকার, সাংবিধানিক অধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেছে সংগঠনটি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পুলিশের আইনানুগ কঠোরতাকে নেতিবাচকভাবে দেখা এবং অপরাধ দমনে নিষ্ক্রিয়তাকে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তাই আইনের সীমার মধ্যে থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংগঠনটি জানায়, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় চারজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এ পরিস্থিতি পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলে দাবি সংগঠনটির।

বিবৃতিতে বলা হয়, পুলিশ সদস্যদের এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি, যেখানে তাঁরা আত্মরক্ষার আইনগত অধিকারসহ প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করে নির্ভয়ে, নিরপেক্ষভাবে ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মতে, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা অপরিহার্য। অপরাধ দমনে পুলিশের আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগে অযথা দ্বিধা অপরাধীদের উৎসাহিত করতে পারে। তবে আইনের সীমা অতিক্রম না করে দৃঢ়তা, নিরপেক্ষতা ও মানবিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনই জনগণের আস্থা বাড়ানোর ভিত্তি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) পুরান ঢাকার চকবাজারে একটি কমিউনিটি ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে, তাহলে আমরা সেটাই করব।’ তাঁর এ বক্তব্যের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন প্রতিবাদ জানায়।

পরে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যকে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ এবং জননিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশের সক্ষমতা জোরদারের আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

তবে ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ, প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের আইনি সীমা এবং এ ধরনের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্নও এ বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *