খসরু মৃধা:
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৪২ নম্বর ওয়ার্ডের পুবাইল বিন্দান এলাকায় ‘এরাবিয়ান গ্লোবাল সিটি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুমোদনহীন আবাসন প্রকল্পের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি অনুমোদন ছাড়াই আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে স্বল্প আয়ের মানুষকে প্লট বিক্রির প্রলোভন দেখানো হচ্ছে।
সাইনবোর্ড ঘিরে বিভ্রান্তি
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাসিক দুই হাজার টাকা কিংবা বার্ষিক ১০ হাজার টাকায় কৃষিজমি ভাড়া নিয়ে সেখানে বড় আকারের ‘এরাবিয়ান গ্লোবাল সিটি’র সাইনবোর্ড বসানো হয়েছে। উপরে লেখা রয়েছে “সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর” এবং নিচে ডানপাশে লেখা আছে “দার প্রপার্টিস ডেভেলপারস লি:।” এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে আশপাশের বিশাল এলাকা কোম্পানির মালিকানাধীন। ফলে স্থানীয় জমি কেনাবেচায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং প্রকৃত জমির মালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
স্থানীয় জমির মালিক, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, জানান, আগের ‘ভাওয়াল হ্যাভেন সিটি’, ‘ফ্রেশ সিটি’ নামক প্রতিষ্ঠান মাসিক দুই হাজার টাকায় তার জমিতে সাইনবোর্ড বসালেও দুই মাস পর থেকে আর ভাড়া দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “প্রথমে ভেবেছিলাম সাময়িকভাবে বোর্ড দেবে। এখন সেটি সরাচ্ছে না, ভাড়াও দিচ্ছে না।” এখন আবার ‘এরাবিয়ান গ্লোবাল’ নামক প্রতিষ্ঠান সাইনবোর্ড বসিয়েছে। আমরা নিরুপায়, কিন্তু আমি তাদের নিকট কোনো জমি বিক্রি করিনি। স্থানীয় বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ ও ইমরান জানান, পূর্বে ‘ভাওয়াল হ্যাভেন সিটি’ এবং এখন আবার নতুনভাবে ‘এরাবিয়ান গ্লোবাল সিটি’ নামক প্রতিষ্ঠান কোনো প্রকার জমি ক্রয় না করে এলাকার সহজ-সরল মানুষকে জমি ভাড়ার প্রলোভন দেখিয়ে জমিতে সাইনবোর্ড ব্যবহার করছে। তারা এর প্রতিকার চান।
অন্যদিকে, কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত সাবেক গাজীপুর মহানগর ছাত্রদলের সহ-সভাপতি স্থানীয় রাজন নামের নতুন প্রজেক্ট ম্যানেজার বলেন, বিন্দান বাদুরতলা মৌজায় অন্যদের দেখাদেখি ‘এরাবিয়ান গ্লোবাল সিটি’ পরীক্ষামূলক প্রচারের জন্য কিছু সাইনবোর্ড লাগিয়েছে। কয়েক শতাংশ জমি খোলা স্ট্যাম্পে বায়না করেছে বলে দাবি তার। তবে তার দাবির পক্ষে কোনো কাগজপত্র বা অনুমোদনের প্রমাণ মেলেনি।
অনুমোদনের তথ্য নেই
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনা কর্মকর্তা ড. সৈয়দা সায়ফা বিনতে আলম জানান, পূবাইলে ‘এরাবিয়ান গ্লোবাল সিটি’ নামে কোনো আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “এই নামে কোনো কোম্পানির বিষয়ে আজ আপনার কাছ থেকেই জানলাম। সিটি কর্পোরেশনের একটি মাস্টার প্ল্যান রয়েছে, যা গাউকের সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বলেন, অনুমোদন ছাড়া কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া বেআইনি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ড্যাপের বাইরে প্রকল্প হলে বেআইনি
রাজউকের আওতাধীন ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রসঙ্গে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, উন্মুক্ত জলাশয় বা কৃষিজমি যদি ড্যাপের অনুমোদনের বাইরে থাকে, সেখানে আবাসন প্রকল্পের নামে জমি ক্রয়-বিক্রয় করা যায় না। অনুমতি ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রম ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে প্রতারণার শামিল হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
আবাসন খাতের সংগঠন BLDA জানিয়েছে, ‘এরাবিয়ান গ্লোবাল সিটি’ তাদের তালিকাভুক্ত কোনো সদস্য নয়।
পরিবেশবিদ ও সিনিয়র সাংবাদিক কালিমুল্লাহ ইকবাল বলেন, অনুমোদন ছাড়া জমি বিক্রির নামে প্রতারণা পুরো আবাসন খাতের জন্য হুমকি এবং এতে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।
দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করা হবে।
হাইকোর্টের আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ বলেন, অনুমোদনহীন যৌথ বিনিয়োগ বা প্লট বিক্রয় কার্যক্রম ভুয়া হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং প্রতারণার দায়ে রাষ্ট্র মামলা করতে পারে।
‘এরাবিয়ান গ্লোবাল সিটি’র কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার ইব্রাহিম খলিলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তারা পূবাইলে ‘এরাবিয়ান গ্লোবাল সিটি’ নামে নতুন আবাসন প্রকল্প চালু করতে চান, এখনো জমি কেনা হয়নি। তবে ‘দার ডেভেলপারস’ নামে তাদের একটি আবাসন প্রকল্প রয়েছে।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে
স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত তদন্ত করে প্রকল্পের বৈধতা যাচাই করা জরুরি। অনুমোদনহীন প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হলে তা রোধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। পূবাইল বিন্দান এলাকার বাসিন্দারা এখন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন।