গাজীপুরে সরকারি ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ, সাংবাদিককে হেনস্তার দাবি

স্টাফ রিপোর্টার:

গাজীপুরে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে অনিয়ম, তথ্যের অসংগতি এবং প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া ও শ্রীপুর উপজেলায় সরকারি ধান সংগ্রহের তথ্য যাচাই করতে গিয়ে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় এক সাংবাদিককে হেনস্তা, তাঁর মোবাইল ফোন আটকে রাখা, ফোন ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং প্রতিবেদন প্রচার করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমের প্রকৃত হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলায় সরকারি তথ্য, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং কৃষকদের অভিজ্ঞতার মধ্যে অসংগতি পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সরকারি নথি, ক্রয় রসিদ, গুদামের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

শ্রীপুরে ধান সংগ্রহের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন

শ্রীপুর উপজেলায় সরকারি ধান সংগ্রহের পরিমাণ নিয়ে বিশেষভাবে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এক পর্যায়ে ১১ জন কৃষকের কাছ থেকে ১১ টন ধান সংগ্রহের তথ্য দেওয়া হয়। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট এলএসডির এক কর্মকর্তার বক্তব্যে ৩২ থেকে ৩৩ টন ধান সংগ্রহের কথা উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এ অবস্থায় প্রকৃতপক্ষে কত টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি ক্রয় রেজিস্টার, কৃষকদের তালিকা, ক্রয় রসিদ এবং গুদামের মজুতের হিসাব মিলিয়ে দেখলেই এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব।

আরও অভিযোগ রয়েছে, তালিকায় নাম থাকা কয়েকজন কৃষক দাবি করেছেন, তাঁরা সরকারি কেন্দ্রে ধান বিক্রি করেননি। এ ছাড়া একজন ব্লক পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্যেও সরকারি কেন্দ্রে ধান কেনা না হওয়া এবং কৃষকদের বারবার ফিরে যাওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে বলে জানানো হয়েছে।

তবে কৃষকদের এসব বক্তব্য এবং ধান সংগ্রহের পরিমাণসংক্রান্ত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকে প্রকৃতপক্ষে ধান কেনা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নথি ও কৃষকদের বক্তব্য যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

সরকারি দরে ধান বিক্রি করতে পারছেন কি কৃষক?

সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমের অন্যতম উদ্দেশ্য কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু সরকারি সংগ্রহকেন্দ্রে ধান বিক্রির সুযোগ না পেলে কৃষকদের বাইরে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগে প্রতি মণ ধানের সরকারি দর ১ হাজার ৪৩৬ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সময় ও মৌসুমের সরকারি প্রজ্ঞাপন যাচাই করে নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কৃষকদের নামে ধান বিক্রির হিসাব দেখানো হলে সেই হিসাবের পক্ষে যথাযথ নথি রয়েছে কি না, প্রকৃত কৃষকেরা সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন কি না এবং সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

তথ্য সংগ্রহের সময় সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগ

সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় গাজীপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে এক সাংবাদিককে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারী সাংবাদিকের দাবি, এ সময় তাঁর মোবাইল ফোন আটকে রাখা হয়। একটি ইনফিনিক্স ফোন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটি আইফোন নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচার করা হলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, প্রাসঙ্গিক নথি, ফোনের ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা-ও প্রতিবেদনে যুক্ত করা জরুরি।

থানায় জিডি ও বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ

সাংবাদিকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ঘটনায় গাজীপুর সদর থানায় ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ১৪৮৪ নম্বর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

এখন এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, তা দেখার বিষয়। সরকারি ধান সংগ্রহের হিসাবসংক্রান্ত অভিযোগ এবং সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগ—দুটিরই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি

সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা প্রশাসন, খাদ্য বিভাগ এবং গাজীপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি নথি, ক্রয় রসিদ, গুদামের হিসাব এবং কৃষকদের তালিকা যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, কৃষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকের অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তির দাবি জানানো হয়েছে।

তবে অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া মানেই তা প্রমাণিত হওয়া নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত, নির্ভরযোগ্য নথি এবং সব পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতেই প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *