গৃহিণীর নামে ১০ কোটি টাকার সম্পদ, আয়কর ফাইলে মিলল নানা অসঙ্গতি

স্টাফ রিপোর্টার ::
সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর কমিশনারের (কর অঞ্চল-১৪, ঢাকা) নিকট একজন সচেতন নাগরিকের দায়ের করা লিখিত অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট আয়কর নথি পর্যালোচনা করে এই চাঞ্চল্যকর কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের চিত্র সামনে এসেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিপুল কান্তি দাসের স্ত্রী পূর্ণিমা দাস, যিনি নথিপত্র অনুযায়ী একজন পুরো দস্তুর গৃহিণী এবং যার নিজস্ব কোনো বৈধ আয়ের উৎস নেই। এমনকি পূর্ণিমা দাসের পিতা সত্য রায় এবং মাতা মিনতি রায়ও আর্থিকভাবে কোনোভাবেই সচ্ছল নন এবং তাদের নিজেদেরও কোনো আয়কর ফাইল বা কর প্রদানের ইতিহাস নেই। অথচ এই গৃহিণী স্ত্রীর নামেই রাতারাতি প্রদর্শন করা হয়েছে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা ও নগদ সম্পদ, যা মূলত বিপুল কান্তি দাসের অবৈধ কালো টাকাকে স্ত্রীর কর ফাইলের আড়ালে বৈধ করার এক সুনিপুণ অপচেষ্টা।

এই অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির মূল কারসাজিটি শুরু হয় ২০২১ সালে, যখন বিপুল কান্তি দাস অত্যন্ত চতুরতার সাথে তার অবৈধ উপায়ে অর্জিত কালো টাকাকে বৈধ রূপ দেওয়ার জন্য তার স্ত্রী পূর্ণিমা দাসের নামে একটি আয়কর ফাইল খোলেন।

নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পূর্ণিমা দাস ২০২১ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি তারিখে কর অঞ্চল-১৪-এর অধীনে কর সার্কেল-৩০৫-এ নিজের নামে একটি ই-টিন (eTIN: 77426690928) সার্টিফিকেট গ্রহণ করেন। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী একজন করদাতার কর প্রদানের ইতিহাস তার টিন সার্টিফিকেট খোলার সময় থেকেই শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু বিপুল কান্তি দাস তার অবৈধ অর্থকে দীর্ঘদিনের বৈধ ব্যবসা থেকে অর্জিত সম্পদ হিসেবে দেখানোর জন্য এক নজিরবিহীন আইনি ফাঁকফোকর ও কারসাজির আশ্রয় নেন। তিনি তার স্ত্রীর কর ফাইলটিকে ২০১০-১১ কর বর্ষ থেকে শুরু করে পেছনের প্রায় নয় বছরের রিটার্ন একসাথে দাখিল করার একটি পরিকল্পনা সাজান। এই কারসাজিতে তাকে পূর্ণ সহযোগিতা করেন কর বিভাগের কিছু অসৎ কর্মকর্তা ও তথাকথিত কর পরামর্শক। এর ফলশ্রুতিতে, ২০২১ সালের ৩০শে জুন তারিখে কর সার্কেল-৩০৫-এর তৎকালীন সহকারী কর কমিশনার মোঃ জাহিদুল ইসলাম অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে পূর্ণিমা দাসের ২০১০-১১ কর বর্ষ থেকে শুরু করে ২০১৮-১৯ কর বর্ষ পর্যন্ত দীর্ঘ নয় বছরের কর নির্ধারণী আদেশ একই দিনে স্বাক্ষর ও অনুমোদন করেন। একটি নতুন টিনধারী গৃহিণীর জন্য কোনো বাস্তবসম্মত নিরীক্ষা ছাড়াই একই দিনে টানা নয় বছরের কর ফাইল অনুমোদনের এই ঘটনাটি কর প্রশাসনের ইতিহাসে একটি বড় অসঙ্গতি ও অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

পূর্ণিমা দাসের এই ২০১০-১১ কর বর্ষের কর নির্ধারণী আদেশ ও রিটার্ন ফাইলটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে তার ব্যবসার ধরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ডিলিংস ইন বিবিধ গুডস’ (Dealings in Misc Goods) অর্থাৎ বিবিধ পণ্যের ব্যবসা। অথচ এই ব্যবসার কোনো বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, দোকান বা গুদামের অস্তিত্বের প্রমাণ নথিতে নেই। এই কাল্পনিক ব্যবসা থেকে ২০১০-১১ কর বর্ষে মাত্র ২,৪০,০০০ টাকা মোট প্রাপ্তি এবং ১,৬০,০০০ টাকা নিট লাভ দেখানো হয়েছে, যার বিপরীতে কর নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ২,০০০ টাকা।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সামান্য আয়ের বিপরীতে উক্ত রিটার্নের ব্যালেন্স শীটে ‘পূর্ববর্তী বছরের পুঁজি’ (Capital as per last year) হিসেবে এক লাফে ৩,৭৭,২১,০০০ টাকা (তিন কোটি সাতাত্তর লাখ একুশ হাজার টাকা) নগদ সম্পদ প্রদর্শন করা হয়েছে! একজন সাধারণ গৃহিণী, যার পিতামাতারও কোনো সচ্ছলতা নেই, তিনি কর ফাইল খোলার প্রথম বছরেই কোথা থেকে এই পৌনে চার কোটি টাকার বিশাল পুঁজি পেলেন, তার কোনো ব্যাখ্যা বা উৎস আয়কর নথিতে দেওয়া হয়নি।

কর নির্ধারণী আদেশে আরও দেখা যায়, ৩০শে জুন, ২০১০ তারিখে পূর্ণিমা দাসের মোট নিট সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১০,১০,৯৬,০০০ টাকা (দশ কোটি দশ লাখ ছিয়ানব্বই হাজার টাকা), যা তার আগের বছর অর্থাৎ ৩০শে জুন, ২০০৯ তারিখে ছিল ১০,১০,২১,০০০ টাকা। অর্থাৎ কর প্রদানের প্রথম বছরেই একজন গৃহিণীকে প্রায় দশ কোটি টাকার মালিক বানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা মূলত বিপুল কান্তি দাসের কর ফাঁকি ও কালো টাকা যুক্ত করার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।

পরবর্তী কর বর্ষগুলোতেও (যেমন ২০১১-১২, ২০১২-১৩ থেকে শুরু করে ২০১৮-১৯ পর্যন্ত) একইভাবে সামান্য লাভ দেখিয়ে এবং নামমাত্র কর (২,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা) প্রদান করে এই বিশাল সম্পদকে ফাইলে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

এই অনিয়মের ধারাবাহিকতা এখানেই শেষ নয়। করদাতার ২০২০-২১ কর বর্ষের আয়কর রিটার্ন ফাইল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে পূর্ণিমা দাসের ব্যবসার পুঁজি হিসেবে ৩,৭৭,৯৬,০০০ টাকা এবং হাতে নগদ (Cash in hand) হিসেবে ‘পূর্বের ন্যায়’ বিপুল অঙ্কের ৫,৬০,০০,০০০ টাকা (পাঁচ কোটি ষাট লাখ টাকা) নগদ অর্থ দেখানো হয়েছে, যার ফলে তার মোট প্রদর্শিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯,৪০,০০,০০০ টাকা। একজন গৃহিণী বছরের পর বছর কোনো সক্রিয় ব্যবসা বা আয়ের উৎস ছাড়াই কীভাবে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা নগদ ঘরে বা ব্যাংকে অলস ফেলে রাখতে পারেন এবং কীভাবে তার কোটি কোটি টাকার ব্যবসার পুঁজি অপরিবর্তিত থাকে, তা যেকোনো সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দেয়।

স্ত্রীর নামে ১০ কোটি কালো টাকা সাদা করার হীন অপচেষ্টাই নয়, সিটিপোস্টের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বিপুল কান্তি দাস ও তার স্ত্রীর আরো অঢেল সম্পত্তির বিষয়। বিপুল কান্তি দাসের বেশ কয়েকটি ব্যাংক একাউন্টে রয়েছে কোটি কোটি টাকার জ্ঞাত আয় বহিভূত অর্থ। সেইসাথে ধানমন্ডিতে বাসা নম্বর-৬৯, ফ্ল্যাট নম্বরঃ বি-২/৩, রোড নম্বরঃ ১২/এ, ধানমন্ডিঃ আর/এ তে রয়েছে ৭ কোটি টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। আর বনানীর গফুর রিজ গার্ডেনে ফ্ল্যাট নম্বরঃ ৭/এ,বাড়ি নম্বরঃ ৯৬, রোড নম্বর-২৩ ব্লক-এ বনানীঃ আর/এ তে রয়েছে ১২ কোটি টাকার আলিশান ফ্ল্যাট।

আয়কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে স্বামী বিপুল কান্তি দাস নিজের অবৈধ উপার্জন ও কালো টাকাগুলো স্ত্রীর ব্যাংকে জমা রেখে এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে পরবর্তীতে কর ফাইলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। যখনই কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা কর বিভাগ এই অর্থের উৎস জানতে চাইবে, তখনই তারা এই জালিয়াতিপূর্ণ কর ফাইলটি দেখিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাবেন, যা সম্পূর্ণভাবে বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এই সুসংগঠিত কর ফাঁকির কারণে রাষ্ট্র অত্যন্ত মারাত্মকভাবে প্রকৃত আয়কর রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যদি বিপুল কান্তি দাসের এই প্রায় ১০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদকে প্রচলিত নিয়মে করের আওতায় আনা হতো এবং সর্বোচ্চ কর হারে কর আদায় করা হতো, তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব জমা হতো। কিন্তু অসৎ কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ করে নামমাত্র কর প্রদান করে এবং পেছনের কর বর্ষগুলোর ভুয়া ফাইল তৈরি করে এই বিশাল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। কর ফাঁকি দিয়ে বেআইনিভাবে সম্পদ অর্জনের এই ঘটনাটি দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার পাশাপাশি সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করছে। ইতিমধ্যেই এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে কর কমিশনারের কাছে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে আবেদন করা হয়েছে, যেখানে ১০ কোটি টাকার অর্থ সম্পদের সবগুলি কারসাজিযুক্ত রিটার্নের নথিপত্র সংযুক্ত করা হয়েছে।

অভিযোগ কারীর দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে বিপুল কান্তি দাসের অবৈধ সম্পদের উৎস এবং তার স্ত্রী পূর্ণিমা দাসের এই অলৌকিক ১০ কোটি টাকার কর ফাইলের প্রতিটি নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে জরিমানা আরোপসহ যথাযথ আইনি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে রাষ্ট্র তার ন্যায্য রাজস্ব ফিরে পায় এবং এই ধরণের অপরাধীদের আইনের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়।

স্ত্রীর নামে আয়কর ফাইল খুলে কালো টাকা সাদা করার বিষয়ে অভিযুক্ত বিপুল কান্তি দাসের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না। আমার উকিল আপনার উত্তর দিতে পারবেন। লিখিত প্রশ্ন পাঠান। ’’।

পরবর্তীতে বিপুল কান্তি দাসকে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো প্রকার উত্তর প্রদান করেননি। এমনকি তার সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর কল ধরেননি। উপরন্তু বিভিন্ন প্রভাবশালী মাধ্যম মারফত সিটিপোস্টের প্রতিবেদককে ফোন করান।

**পরবর্তী পর্বে আসছে কিভাবে আয়কর কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বিপুল কান্তি দাস তার স্ত্রীর নামে কর ফাঁকির কারসাজি করেছেন তার বিস্তারিত**

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *