কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রাম নগরীতে ইন্টারনেট সেবাদানকারী (আইএসপি) একটি প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘবদ্ধ সশস্ত্র হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও ৩৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় ব্যবসায়ী মহলে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানের মালিকের অভিযোগ, দুই কোটি টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর জেরেই এ হামলা চালানো হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়রা নগরীর বাকলিয়া ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, বিদেশে অবস্থানরত পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা এ হামলার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। ইতোমধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের অভিযান শুরু হয়েছে।
দিনদুপুরে হামলা
জানা যায়, সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর চকবাজার থানাধীন চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস রোডে অবস্থিত ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন)-এর কার্যালয়ে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল অতর্কিত হামলা চালায়।
হামলাকারীরা অফিসে প্রবেশ করেই কর্মচারীদের জিম্মি করে ফেলে। এরপর অফিসজুড়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। তারা কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম, আসবাবপত্র ও কর্মচারীদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ভেঙে ফেলে। হামলার সময় অফিসে উপস্থিত নারী-পুরুষ গ্রাহক ও কর্মীরা আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করেন।
প্রতিষ্ঠানটির সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলাকারীদের একজন চাইনিজ কুড়াল দিয়ে অফিসের কম্পিউটার, ডেস্কটপ ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম কুপিয়ে ভাঙচুর করছে। পুরো অফিস লন্ডভন্ড করে ফেলে তারা। কাচের শোকেস, টেবিল, চেয়ারসহ প্রায় সব আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলাকারীরা একটি ল্যাপটপও নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি
প্রতিষ্ঠানটির মালিক আদিল বিন মামুন অভিযোগ করেন, ঘটনার দুই দিন আগে বিদেশি একটি নম্বর থেকে মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাকে ফোন করেন। তিনি ব্যবসা চালিয়ে যেতে হলে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন।
আদিল বিন মামুনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফোনে তাকে সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়। বলা হয়, “ব্যবসা করতে হলে দুই কোটি টাকা প্রস্তুত রাখবেন, আর প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে দিতে হবে।”
৩৫ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক রিদোয়ানুল কবির জানান, হামলাকারীরা কর্মচারীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বেতন পরিশোধের জন্য অফিসে রাখা প্রায় ৩৫ লাখ টাকা নিয়ে যায়। পুরো ঘটনাটি প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে।
হামলার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির ইন্টারনেট সেবা কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এতে ওই এলাকার অসংখ্য গ্রাহক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগের হামলারও উল্লেখ
প্রতিষ্ঠানটির মালিক আরও দাবি করেন, ফোনে ডেভিড ইমন নিজেকে চট্টগ্রামে পরিচিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন এবং বলেন, চাইলে পুলিশ কমিশনারকে তার ছবি দেখিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা যাবে।
একই সঙ্গে তিনি স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসায় চাঁদা না পেয়ে গুলি চালানোর ঘটনার উল্লেখ করে একই ধরনের পরিণতির হুমকিও দেন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ডিডিএন কার্যালয়ের পাশেই পুলিশি নিরাপত্তায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। অভিযোগ ছিল, কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা ওই হামলা চালিয়েছিল। এর আগে ২ জানুয়ারিও একই বাসায় গুলির ঘটনা ঘটে।
পুলিশের বক্তব্য
হামলার পরপরই চকবাজার থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পরে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে।
যাকে ঘিরে অভিযোগ
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। তিনি বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে চট্টগ্রামে অপরাধী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ জানায়, তার বিরুদ্ধে অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার আলোচিত জোড়া হত্যা মামলা এবং একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যা মামলাও রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ইমন অস্ত্র ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ এবং বড় সাজ্জাদের নির্দেশে চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন অপরাধ পরিচালনা করে আসছেন।
সক্রিয় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধী নেটওয়ার্ক পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোবারক হোসেন ও মোহাম্মদ রায়হান। এর আগে এ নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে ছিলেন ছোট সাজ্জাদ, যিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
রায়হানের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে প্রায় ৫০ জন অস্ত্রধারী সদস্য ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে। তারা বিভিন্ন ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করছে।
ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার, চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বেড়েছে। তারা নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।