চিঠি থেকে লজিস্টিকস, বদলে যাচ্ছে ডাক বিভাগের সেবা

মোঃ ইসলাম উদ্দিন তালুকদার

ব্যক্তিগত চিঠি আদান-প্রদানের সেই পুরোনো দিন অনেকটাই ফুরিয়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, মোবাইল ফোন, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে ব্যক্তিগত চিঠি পাঠানোর প্রবণতা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। একসময় ব্যক্তিগত চিঠিই ছিল ডাক বিভাগের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই চাহিদা কমে যাওয়ায় ডাক বিভাগকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।

যদিও দাপ্তরিক ও আদালতের চিঠিপত্র এখনো ডাক বিভাগের মাধ্যমে আদান-প্রদান হচ্ছে, তবু ব্যক্তিগত চিঠির জায়গা দখল করে নিয়েছে পার্সেল, লজিস্টিকস ও ই-কমার্স পণ্য পরিবহনের নতুন বাজার। এ পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে ডাক বিভাগ।

ডাক বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে মোট ৯ হাজার ৮৮৬টি পোস্ট অফিস রয়েছে। এর মধ্যে ডাক বিভাগের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত পোস্ট অফিস রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি। এছাড়া প্রায় ৮ হাজার ৩০০টি এজেন্ট পোস্ট অফিসের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ডাকসেবা দেওয়া হচ্ছে।

বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে প্রচলিত ডাকসেবার পাশাপাশি পার্সেল, পণ্য পরিবহন, ই-কমার্স ডেলিভারি এবং বিভিন্ন ধরনের আধুনিক লজিস্টিকস সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, ব্যক্তিগত চিঠি একসময় ডাক বিভাগের আয়ের অন্যতম উৎস হলেও বর্তমানে এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমে গেছে। তবে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমলেও দাপ্তরিক ডাক এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ডাকের পরিমাণ বাড়ছে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসব ডাকের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ কোটি ৫ লাখ। পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডাকের পরিমাণ আরও বেড়ে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখে পৌঁছেছে। অর্থাৎ তিন অর্থবছরে ডাকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ডাকের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ডাক বিভাগের আয়ও বেড়েছে। সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডাক বিভাগের আয় ছিল প্রায় ২১৯ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৫৩ কোটি টাকায়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডাক বিভাগের আয় আরও বেড়ে প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে ডাক বিভাগের আয় বেড়েছে প্রায় ১১৭ কোটি টাকা।

তবে আয় বাড়লেও পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় তা এখনো অনেক কম। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ডাক বিভাগের বছরে প্রায় ৮ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হয়। এছাড়া পেনশন ও আনুতোষিক বাবদ ব্যয় হয় ২৬০ কোটি টাকারও বেশি।

ফলে ডাক বিভাগের আয় কয়েক বছরে বাড়লেও মোট ব্যয়ের তুলনায় তা এখনো যথেষ্ট নয়। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটির আয় বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে নতুন সেবা চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মূলত ডাক বিভাগের মোট বাজেটের বড় একটি অংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় হওয়ায় আয় বৃদ্ধির নতুন পথ খুঁজছে কর্তৃপক্ষ।

ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের দ্রুত প্রসারকে সামনে রেখে ডাক বিভাগ এখন ঘরে ঘরে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে। এ লক্ষ্যে দেশব্যাপী ১৪টি ফুলফিলমেন্ট সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এসব কেন্দ্রে পণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বুকিং, বাছাই, পরিবহন ও গ্রাহকের কাছে বিলির ব্যবস্থা থাকবে। এর মাধ্যমে ই-কমার্স ব্যবসায়ী ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সমন্বিত পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার তেজগাঁওয়ের পাশাপাশি গোপালগঞ্জ, ঈশ্বরদী, ময়মনসিংহ, খুলনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও যশোরে এসব ফুলফিলমেন্ট সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব কেন্দ্র চালু হলে পণ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি আরও সংগঠিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

একই সঙ্গে ডাকসেবার পরিধি বাড়াতে উদ্যোক্তাদের যুক্ত করে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস চালু করা হয়েছে। এসব উদ্যোক্তা মূলত পণ্য সংগ্রহ ও বিলির কাজে যুক্ত থাকবেন। ডাক বিভাগের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চুক্তির মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের এই ব্যবস্থায় যুক্ত করা হবে। তাদের কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করবে ডাক বিভাগ।

কোনো ধরনের অনিয়ম ধরা পড়লে কিংবা সেবার মান ক্ষুণ্ণ হলে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তার সঙ্গে করা চুক্তি বাতিলের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।

ডাক বিভাগের নতুন পরিকল্পনায় কৃষিপণ্য পরিবহনকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উৎপাদিত মৌসুমি ফল দ্রুত গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের বিদ্যমান নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা দেখা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন উৎস জেলা থেকে ৩১২ টনের বেশি মৌসুমি ফল সংগ্রহ করে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ডাক বিভাগ। এর মধ্যে রাজশাহীর আম ছাড়াও সাতক্ষীরা, খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ফল পরিবহন করা হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তারা উপকৃত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এর পাশাপাশি ডাকসেবায় অনলাইন ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রাহক যাতে তার পাঠানো পণ্য বা পার্সেলের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।

স্পিডপোস্ট ও এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিসের পাশাপাশি দেশব্যাপী মেইল প্রসেসিং সেন্টারও স্থাপন করা হয়েছে। ফলে প্রচলিত ডাকসেবার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা যুক্ত করার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

ডাক বিভাগের সেবার পরিধিতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের হোম ডেলিভারি সেবা যুক্ত হয়েছে। ভূমির পর্চা ও খতিয়ান হোম ডেলিভারির পাশাপাশি পাসপোর্টের বাল্ক ডেলিভারি চালু রয়েছে। এর সঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক মামলা-সংক্রান্ত নথি প্রেরণও ডাক বিভাগের সেবার আওতায় যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ

আধুনিক লজিস্টিকস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট, পুরোনো ব্যবস্থাপনা এবং সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, ডাক বিভাগের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করতে তিনটি মেইল মনিটরিং সফটওয়্যার তৈরির কাজ চলছে। এসব সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডাকের গতিপথ, বিলম্ব এবং সরবরাহ কার্যক্রম নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় অর্থ লেনদেন, পণ্যের নিরাপত্তা এবং গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষার বিষয়েও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারণ ই-কমার্স ও পার্সেল সেবায় পণ্যের নিরাপত্তা, সময়মতো ডেলিভারি এবং গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডাক বিভাগ নতুন এসব সেবা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে এগোতে চাইছে। মূলত ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমে যাওয়ার কারণে ডাক বিভাগের প্রচলিত ব্যবসায়িক কাঠামোয় যে পরিবর্তন এসেছে, তা মোকাবিলায় এখন পার্সেল, ই-কমার্স, কৃষিপণ্য পরিবহন ও লজিস্টিকস সেবাকে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।

২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় পার্সেল পৌঁছানোর উদ্যোগ,

এ প্রসঙ্গে ডাক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জাকির হাসান নূর জানান, ডাক বিভাগ একটি সরকারি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। সে কারণে শুধু লাভ-লোকসানের মাপকাঠিতে এর মূল্যায়ন করা যাবে না।

তিনি বলেন, প্রযুক্তির কারণে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমলেও দাপ্তরিক ও আদালতের চিঠিপত্রের পরিমাণ বেড়েছে। বর্তমানে সড়ক ও রেলপথের সমন্বয়ে ডাক বিভাগে আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

তিনি জানান, দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ঢাকায় ২৪ ঘণ্টা এবং এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইন বিক্রেতাদের সুবিধার্থে বাড়ি বা অফিস থেকে পণ্য সংগ্রহের জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস মডেল চালু করা হয়েছে।

এর মাধ্যমে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনাকারীরা ডাক বিভাগের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সহজে পণ্য সংগ্রহ করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা বদলে যাওয়ায় ডাক বিভাগের প্রচলিত কার্যক্রমেও পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ব্যক্তিগত চিঠির ওপর নির্ভরশীলতা কমলেও পার্সেল, ই-কমার্স পণ্য, কৃষিপণ্য, দাপ্তরিক নথি ও বিভিন্ন ধরনের হোম ডেলিভারি সেবায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক লজিস্টিকস সেবায় রূপান্তরের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *