জীবনের মায়ার টানে ফাইতং যাচ্ছে না পরিবেশ অধিদপ্তর

কামরুল  ইসলাম:

বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং এলাকা—প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা এক পাহাড়ি জনপদ। অথচ সেই সবুজে ঘেরা অঞ্চল আজ ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে ধ্বংসস্তূপে। অভিযোগ উঠেছে, এখানে গড়ে ওঠা অর্ধশতাধিক অবৈধ ইটভাটার দৌরাত্ম্যে উজাড় হচ্ছে পাহাড়, ধ্বংস হচ্ছে বনভূমি, বিপন্ন হয়ে পড়ছে জীববৈচিত্র্য।

সরেজমিন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এসব ইটভাটায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে পাহাড় কেটে আনা মাটি। আর জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হচ্ছে পাহাড়ের মূল্যবান গাছের চারা ও বনজ সম্পদ। ফলে প্রতিনিয়ত কমছে বনাঞ্চল, বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে নানা প্রজাতির গাছপালা ও বন্যপ্রাণী।

স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি বাসিন্দারা জানান, এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস তাদের নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, “সাংবাদিকদের বলেও কোনো লাভ হয় না। অনেক সময় আমাদের বক্তব্য ভিডিও করে ইটভাটা মালিকদের দেখিয়ে দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় আমাদের ওপর হয়রানি ও নির্যাতন।”

ফাইতংয়ের বদরটিলা সংলগ্ন এফএসি ইটভাটার চিত্র এখন পুরো এলাকার বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। যেখানে বন সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষার কথা, সেখানে উল্টো বন উজাড়ের প্রতিযোগিতা চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এদিকে বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। সরকারের পক্ষ থেকে বন রক্ষার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা কিংবা রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, “রক্ষক যখন ভক্ষক হয়ে যায়, তখন পাহাড় ও বনভূমি রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।”

পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কিছুদিন আগে ফাইতং এলাকায় অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে তারা ইটভাটা মালিকদের ভাড়া করা সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা বাইরে থেকে গিয়ে কতদিন অভিযান চালাব? স্থানীয় বন বিভাগের দায়িত্ব বন রক্ষা করা, কিন্তু তারা কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করছে না।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় ও বনভূমি ধ্বংসের ফলে শুধু পরিবেশগত ক্ষতিই নয়, অর্থনৈতিক ক্ষতিও হচ্ছে ব্যাপক। সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। পাশাপাশি বনভূমি ধ্বংসের কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় তারা লোকালয়ে চলে আসছে, বাড়ছে মানুষ-প্রাণীর সংঘর্ষ।

স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর হাতি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আক্রমণে প্রাণ হারাচ্ছেন পাহাড়ি ও বাঙালি বাসিন্দারা। তাদের প্রশ্ন—এই মৃত্যুর দায় নেবে কে? তারা সরাসরি দায়ী করছেন ফাইতং এলাকার ইটভাটা মালিক ও সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের কর্মকর্তাদের।

এ অবস্থায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব নয়। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে ফাইতংয়ের পাহাড়ি বনভূমি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে—এমন আশঙ্কাই করছেন স্থানীয়রা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *