টাঙ্গাইলে প্রাইমারি স্কুলের দেড় হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য, পাঠদান ব্যাহত

মোঃ মশিউর রহমান, টাঙ্গাইলঃ


টাঙ্গাইল জেলার এক হাজার ৬২৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক হাজার ৪৫৯টি শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ৮৮৮ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক এবং ৫৭১টি সহকারী শিক্ষকের পদ খালি। নিয়োগ ও পদোন্নতিসহ নানা জটিলতায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রম। শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। ভুক্তভোগীরা দ্রুত সমাধানের দাবি করেছেন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানায়, টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় ১ হাজার ৬২৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক পদে ঘাটাইল উপজেলায় ১৭২ জনের মধ্যে ১১০, সখীপুর উপজেলায় ১৪৭ জনের মধ্যে ২৪, গোপালপুর উপজেলায় ১৬১ জনের মধ্যে ১২৬, বাসাইল উপজেলায় ৭৯ জনের মধ্যে ৩০, সদর উপজেলায় ১৬৩ জনের মধ্যে ৭৪ জন, দেলদুয়ার উপজেলায় ১০০ জনের মধ্যে ৬৩, মির্জাপুর উপজেলায় ১৭০ জনের মধ্যে ৬০, কালিহাতী উপজেলায় ১৭০ জনের মধ্যে ১১২, মধুপুর উপজেলায় ১১০ জনের মধ্যে ৭৩, নাগরপুর উপজেলায় ১৫৬ জনের মধ্যে ১০৫, ভূঞাপুর উপজেলায় ১১০ জনের মধ্যে ৭৫ এবং ধনবাড়ী উপজেলায় ৮৫ জনের মধ্যে ৩৬ জনের মোট ৮৮৮টি পদ শূন্য রয়েছে। কর্মরত রয়েছেন ৭৩৫ জন প্রধান শিক্ষক।

জেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ সংখ্যা ৯ হাজার ৬৮টি। এর মধ্যে ঘাটাইল উপজেলায় ৮৫, সখীপুর উপজেলায় ২৯, গোপালপুর উপজেলায় ৮১, বাসাইল উপজেলায় ১৩, সদর উপজেলায় ৪১, দেলদুয়ার উপজেলায় ৪৬, মির্জাপুর উপজেলায় ৫০, কালিহাতী উপজেলায় ৬৪, মধুপুর উপজেলায় ২৭, নাগরপুর উপজেলায় ৬৫, ভূঞাপুর উপজেলায় ৫৪ ও ধনবাড়ী উপজেলায় ১৬ জনসহ মোট ৫৭১টি পদ শূন্য আছে। কর্মরত আছেন ৮ হাজার ৪৯৭ জন সহকারী শিক্ষক।

ঘাটাইল উপজেলার খাজনাগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক) নাসির উদ্দিন জানান, ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ১১২ জন। আমাদের দুই শিফটে পাঠদান হয়ে থাকে। শিক্ষক পদসংখ্যা ৫ জন হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন। অফিশিয়াল অনেক নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে ব্যস্ত থাকতে হয়। বাকি একজন শিক্ষকের পক্ষে পাঠদান করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে যেমন বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়ছে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছেন। সমস্যার দ্রুত সমাধান চাচ্ছি।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলা শাখার সভাপতি বাশিরুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ এবং মানসম্মত শিক্ষা অর্জনে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। একজন শিক্ষককে সপ্তাহে প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি ক্লাস নিতে হয়। শিক্ষক ঘাটতি থাকা বিদ্যালয়ে ৩৫ থেকে ৪০টি নিতে হয়। ফলে শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষে শেখানো কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও শিক্ষার্থীর শিখন নিশ্চিত করা যায় না। বেইজলাইন সার্ভে পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব। প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। আশা করছি দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান করবে।

টাঙ্গাইলের সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ শহীদুজ্জামান মিয়া জানান, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড এবং আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। তাই প্রতিটি শিশুকে মানসম্মত শিক্ষায় গড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যেন বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে, সেটা খেয়াল করতে হবে। শিক্ষাদান পদ্ধতির উন্নতির জন্য শিক্ষকদের বাস্তবভিত্তিক যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দরকার।

টাঙ্গাইল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীন মিয়া জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে বিদ্যালয়গুলোয় পাঠদানসহ নানা সমস্যা হয়। শূন্যপদের মধ্যে বেশিরভাগই প্রান্তিক ও দুর্গম অঞ্চলের। সংযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষক সমন্বয় করে সমাধান করার চেষ্টা চলছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সরকারকে শূন্যপদ পূরণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মঠ এবং মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান আছে। প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষকতা করতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতার নিয়ম আনতে হবে। সেইসঙ্গে চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের পদোন্নতি দিয়ে সহকারী শিক্ষকের পদে নিয়োগ সম্ভব হবে।

ফটো ক্যাপশন— শিক্ষক সংকটে থাকা টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার পাহাড়ি এলাকার খাজনাগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *