স্টাফ রিপোর্টার:
নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ডিলারদের মাধ্যমে ভোজ্যতেল, ডাল ও চাল বিক্রি করে আসছে। তবে এই ডিলারশিপের লাইসেন্স নবায়ন ও দোকানের ঠিকানা পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর ঢাকা উত্তর থেকে ঢাকা দক্ষিণে ডিলারশিপ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে মৃত বলে দাবি করা এক ডিলারকে জীবিত দেখিয়ে এবং অস্থায়ীভাবে মুদি দোকান সাজিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন টিসিবির ডিলার আরিফ এবং তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেওয়া ছকিনা নামের এক নারী। অভিযোগ অনুযায়ী, আরিফের মৃত্যুর পরও তাঁকে জীবিত দেখিয়ে তাঁর নামে ডিলারশিপের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঢাকা উত্তর থেকে ঢাকা দক্ষিণে ডিলারশিপের ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য রাজধানীর কদমতলী থানাধীন গ্যাস রোড এলাকায় একটি দোকান ভাড়া নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। ওই দোকানটি আওয়ামী লীগ নেতা বাপ্পির বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্যাস রোডের ওই স্থানে দীর্ঘদিন ধরে একটি চায়ের দোকানের পাশে ছোট একটি দোকানঘর ছিল। সেটি স্থানীয় এক পিঠা বিক্রেতা ভাড়া নিয়ে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করতেন। সেখানে নিয়মিত মুদি দোকানের কার্যক্রম পরিচালিত হতো না। কিন্তু টিসিবির ডিলারশিপের ঠিকানা পরিবর্তন ও লাইসেন্স নবায়নের জন্য জায়গাটিকে ‘শাহাদাত স্টোর’ নামে একটি মুদি দোকান হিসেবে দেখানো হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, দোকানমালিক বাপ্পি কারাগারে থাকাকালে তাঁর বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা এক চাচাকে রাজি করিয়ে ছকিনা এক দিনের জন্য দোকানটি ভাড়া নেন। এরপর কয়েক বস্তা চাল এবং পাশের দোকান থেকে চিপসের প্যাকেট এনে সেখানে মুদি দোকানের মতো পরিবেশ তৈরি করা হয়। ওই সাময়িকভাবে সাজানো দোকান পরিদর্শনের সময় দেখিয়েই মৃত বলে দাবি করা ডিলার আরিফের নামে টিসিবির ডিলারশিপের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, ওই স্থানে আগে নিয়মিত কোনো মুদি দোকান ছিল না। তাঁদের দাবি, দোকানটি এক দিনের জন্য সাজানো হয়েছিল। পরে সেখানে আগের মতো দোকানের কার্যক্রম আর দেখা যায়নি। স্থানীয়দের এমন বক্তব্যের পর দোকানটির প্রকৃত অবস্থা, ভাড়ার চুক্তি এবং টিসিবির পরিদর্শন প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, আরিফের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেওয়া ছকিনা কখনো ওই দোকানে নিয়মিত বসেননি এবং সেখান থেকে টিসিবির পণ্য বিক্রিও করেননি। অথচ টিসিবির ডিলারশিপ পরিচালনার জন্য নির্ধারিত দোকান ও পণ্য বিক্রির কার্যক্রম থাকার কথা। ফলে প্রকৃতপক্ষে ওই দোকান থেকে টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, ডিলারশিপ নবায়ন ও ঠিকানা পরিবর্তনের বিষয়টি ঘিরে টিসিবির আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ঘুষের বিনিময়ে ডিলারশিপের লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এ অভিযোগে টিসিবির ঢাকা আঞ্চলিক কর্মকর্তা সোহাবুর রহমানের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে টিসিবির ঢাকা আঞ্চলিক কর্মকর্তা সোহাবুর রহমান বলেন, তাঁরা ওই দোকান পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। সেখানে মুদি দোকান দেখতে পেয়েছেন বলেই লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। তবে ওই স্থানে যদি ডিলার আরিফের নামে প্রকৃত কোনো মুদি দোকান না থাকে এবং সেখানে টিসিবির পণ্য বিক্রি না করা হয়, তাহলে সেটি আইনগতভাবে অভিযোগের বিষয় হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ডিলার আরিফের প্রতিনিধি তাঁকে জানিয়েছেন, দোকান পরিবর্তনের জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে আবেদন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের সুপারিশ পাওয়ার পর তাঁরা যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দিলেই কেবল দোকান পরিবর্তন করা যাবে। এর আগে দোকান পরিবর্তনের সুযোগ নেই।
দোকান পরিবর্তনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সোহাবুর রহমান বলেন, তাঁদের দপ্তর থেকে এ ধরনের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তাঁদের না জানিয়ে বা অনুমোদন ছাড়া দোকান পরিবর্তন করা হয়ে থাকলে তা অপরাধ। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, ডিলার আরিফের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ছকিনা পরিচয়ে এক নারী ফোন রিসিভ করেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর স্বামী অসুস্থ। প্রতি তিন মাস পরপর তাঁকে রক্ত দিতে হয়। এ কারণে তিনি কথা বলতে পারেন না। দোকান পরিবর্তনের জন্য তাঁরা আবেদন করেছেন বলেও জানান ওই নারী।
তবে অভিযোগে আরিফকে মৃত ডিলার হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তাঁর প্রতিনিধি পরিচয়ে ফোনে কথা বলা নারী তাঁকে স্বামী হিসেবে উল্লেখ করে অসুস্থতার কথা জানিয়েছেন। ফলে আরিফের প্রকৃত অবস্থা, ডিলারশিপের মালিকানা এবং প্রতিনিধির বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, টিসিবির ডিলারশিপের লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে দোকানের বাস্তব অস্তিত্ব, নিয়মিত পণ্য বিক্রির কার্যক্রম, ঠিকানা পরিবর্তনের অনুমোদন এবং ডিলারের জীবিত থাকার বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি ভর্তুকির পণ্য সাধারণ মানুষের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র, দোকান পরিদর্শনের প্রতিবেদন, লাইসেন্স নবায়নের কাগজপত্র এবং অভিযোগে উল্লিখিত ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।