আলমাস হোসাইন:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল সাভার–আশুলিয়া নিয়ে গঠিত ঢাকা–১৯ আসন এখন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রে। শ্রমঘন এই এলাকায় ভোটের আচরণ বরাবরই কিছুটা ভিন্নধর্মী—এখানে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি এবং মাঠপর্যায়ের উপস্থিতিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয় ফলাফল।
বর্তমান নির্বাচনী চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে সক্রিয় এবং দৃশ্যমান অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। দলটির মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দীন বাবু দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় রাজনীতি করছেন। তৃণমূল পর্যায়ে তার কর্মী-সমর্থকদের শক্ত নেটওয়ার্ক এবং নিয়মিত গণসংযোগ তাকে স্বস্তির জায়গায় রেখেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর আলাদা প্রার্থী না থাকায় বিরোধী ভোটের একটি বড় অংশ তার ঝুলিতে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিশ্লেষকরা।
তবে সমীকরণ একেবারে একমুখী—এমনটা বলার সুযোগও নেই। ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেত্রী দিলশানা পারুল নতুন মুখ হলেও প্রচারণায় পিছিয়ে নেই। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই তার সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদিও জোটের ভেতরের সমন্বয়হীনতা ও শরিকদের আলাদা অবস্থান তার ভোটের সম্ভাবনাকে কিছুটা জটিল করে তুলেছে।
এদিকে এলডিপি প্রার্থী সাবেক সেনা কর্মকর্তা চৌধুরী হাসান সোহরাওয়ার্দীও নিরবচ্ছিন্নভাবে মাঠে রয়েছেন। সাভার ক্যান্টনমেন্টের সাবেক জিওসি হিসেবে এলাকায় তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও প্রভাব রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্দিষ্ট একটি ভোটব্যাংকে তিনি প্রভাব ফেলতে পারেন, যা মূল দুই প্রার্থীর সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, জাতীয় পার্টি ও মুসলিম লীগের প্রার্থীরা মাঠে থাকলেও তাদের প্রভাব মূলত সীমিত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। তবে বহুমুখী প্রার্থিতা ভোট বিভাজনের নতুন হিসাব তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ফলাফলে চমক আনতেও পারে।
ঢাকা–১৯ আসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্য। শিল্পকারখানা ও আবাসিক এলাকার মিশ্রণে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভোটার রয়েছেন। স্থানীয় ইস্যু—কর্মসংস্থান, শ্রমিক অধিকার, যানজট, জলাবদ্ধতা ও নাগরিক সেবার মান—ভোটের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে শুধু দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলে ভোটের সমীকরণ বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। শেষ মুহূর্তের জোট সমঝোতা, ভোট বিভাজন কিংবা নীরব ভোটারদের সিদ্ধান্ত—সবকিছু মিলিয়েই নির্ধারিত হবে ঢাকা–১৯ আসনের চূড়ান্ত ফল।
উল্লেখ্য, এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৭,৪৭,০৭০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩,৭৯,৯০৭ জন, নারী ৩,৬৭,১৫০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৩ জন। ফলে বিপুল ভোটার উপস্থিতি এবং বহুমাত্রিক সামাজিক বাস্তবতা এই আসনকে করে তুলেছে নির্বাচনী দৌড়ে অন্যতম আলোচিত ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।