জেলা প্রতিনিধি:
লালমনিরহাটের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক। বুড়িমারী স্থলবন্দরকে ঘিরে ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এই মহাসড়ক। প্রতিদিন কয়েক শ ভারী পণ্যবাহী ট্রাকসহ হাজারো যানবাহন চলাচল করে এ পথে।
তবে বাণিজ্য ও যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটি এখন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরু সড়ক, বিভিন্ন স্থানে বেহাল অবস্থা, অপরিকল্পিত সংস্কারকাজ এবং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ফোর লেন প্রকল্পের কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ও চলতি বছরের এ পর্যন্ত লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়ে অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তবে আহত ও পঙ্গুত্বের পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
সড়কটির প্রশস্ততা না বাড়লেও বুড়িমারী স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। ভারী পণ্যবাহী ট্রাক, দূরপাল্লার বাসের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও অন্যান্য ধীরগতির যানবাহন চলাচল করায় সরু সড়কে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের ঝুঁকি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ ও ইট উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও সংস্কারের নামে সড়কের ওপর ইট ও খোয়া ফেলে রাখা হয়েছে। এতে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে আদিতমারী উপজেলার নামুড়ি-পলাশী এবং কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী এলাকার কিছু অংশসহ বিভিন্ন স্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা লাভলু মিয়া বলেন, ‘সড়কটি এমনিতেই অনেক সরু। এর ওপর বিভিন্ন জায়গায় রাস্তার ইট-খোয়া উঠে গেছে। আবার মেরামতের নামে কোথাও কোথাও সড়কের ওপর ইট ফেলে রাখা হয়। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে। দ্রুত সড়কটি ফোর লেনে উন্নীত করা হলে মানুষের দুর্ভোগ ও দুর্ঘটনা অনেকটাই কমবে।’
জেলায় কর্মরত সাংবাদিক খোরশেদ আলম সাগর বলেন, লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ প্রতিদিন এই মহাসড়ক ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে বুড়িমারী স্থলবন্দরের পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যমও এটি। দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়কটি ফোর লেনে উন্নীত করার কথা বলা হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি কম। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে। দ্রুত সড়কটি নিরাপদ ও প্রশস্ত করা প্রয়োজন।
লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে জেলা পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সড়কের তুলনায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। এর সঙ্গে চালকদের বেপরোয়া গতি, পণ্যবাহী যানবাহনের অতিরিক্ত ওজন এবং মহাসড়কে ধীরগতির থ্রি-হুইলার ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করছে পুলিশ।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের লালমনিরহাটের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক বলেন, মহাসড়কের খানাখন্দ নিয়মিত ও রুটিন মেরামতের মাধ্যমে যান চলাচলের উপযোগী রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। বুড়িমারী ও মিশন মোড় থেকে সাপটিবাড়ীসহ বাজারসংলগ্ন ব্যস্ত এলাকাগুলোতে সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, স্থায়ী সমাধানের জন্য পুরো মহাসড়কটি ফোর লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে ১১০ ফুট জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক সার্ভে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন নকশার কাজ চলছে। এরপর ডিপিপি অনুমোদনের কার্যক্রম শুরু হবে। ভূমি অধিগ্রহণসহ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করে মূল প্রকল্পের কাজ মাঠপর্যায়ে শুরু হতে আরও অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে।
লালমনিরহাট জেলা ট্রাক ও ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, লালমনিরহাট থেকে বুড়িমারী পর্যন্ত মহাসড়কটি অনেকটাই সরু। ট্রাক ওভারটেক করার সময় প্রায়ই যানজট তৈরি হয় এবং কখনো কখনো বড় দুর্ঘটনাও ঘটে। বুড়িমারী স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ট্রাক চলাচল করলেও সড়কটি সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো প্রশস্ত নয়।
তিনি দ্রুত মহাসড়কটি প্রশস্ত করে ফোর লেনে উন্নীত করার দাবি জানান।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের ট্রাফিক শাখার সহকারী পরিচালক মাহমুদুর হাসান বলেন, মহাসড়কটি তুলনামূলক সরু হওয়ায় প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়। এতে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় লাগে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সড়কটি ফোর লেনে উন্নীত করা হলে এ অঞ্চলের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
তিনি জানান, প্রতিদিন ভুটান থেকে প্রায় ২০০টি এবং ভারত থেকে প্রায় ১৫০টি ট্রাক বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসে। এসব পণ্য বাংলাদেশি ট্রাকের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হয়। যানজটের কারণে অনেক সময় একদিনে পণ্য পরিবহন শেষ করা সম্ভব হয় না। সড়ক উন্নত হলে পরিবহন সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে এই মহাসড়ক নিয়ে অনেক তোড়জোড় করা হয়েছিল। বাজেট পাস, নকশা ও টেন্ডারের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতি ছিল শূন্য। এখন নতুন করে সড়কটির অ্যালাইনমেন্ট সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সড়কটি সোজা করতে এবং ফোর লেনে উন্নীত করতে ব্যাপক জমি অধিগ্রহণের জটিলতা রয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের ক্ষতি যতটা কমানো যায়, অর্থাৎ যতটুকু জমি না নিলেই নয়, ততটুকু অধিগ্রহণ করে দ্রুততম সময়ে মহাসড়কটি ফোর লেনে রূপান্তরের কাজ শুরু করা হবে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই পথটি দীর্ঘদিন ধরে অপ্রশস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে দ্রুত মহাসড়কটি ফোর লেনে উন্নীত করার পাশাপাশি চলমান সংস্কারকাজ মানসম্মতভাবে সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন তারা।