মোঃআনজার শাহ
দ্বীনি শিক্ষা, ওয়াজ ও দাওয়াতি কার্যক্রমের পাশাপাশি রাজনীতির মাঠেও সমানভাবে সক্রিয় এক পরিচিত নাম ড. ইরফান বিন তোরাব আলী। আলেম সমাজে শায়খুল হাদিস হিসেবে পরিচিত এই ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে জাতীয় ওলামা পার্টির নেতৃত্বে উঠে আসেন। একই সঙ্গে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি হিসেবে স্থানীয় রাজনীতিতেও দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন তিনি।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেয়ে লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। নির্বাচনী ফলাফলে ৩ হাজার ৭২১ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে নিজের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ রাখেন তিনি।
দ্বীনি শিক্ষার পরিমণ্ডল থেকে জনসম্পৃক্ততার বিস্তার:
ইরফান বিন তোরাব আলীর পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর ধর্মীয় শিক্ষা ও দাওয়াতি কার্যক্রম। কওমি ধারার শিক্ষায় গড়ে ওঠা এই আলেম ইসলামি জ্ঞান, হাদিস ও শরিয়াহ বিষয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। ঢাকার কেরানীগঞ্জে জামেয়া ফারুকীয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও মুহতামিম হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে দ্বীনি শিক্ষার প্রসার এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞান বিস্তারে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন তিনি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইসলামি মাহফিল, ওয়াজ ও উলামা-মাশায়েখদের নানা আয়োজনে তাঁর অংশগ্রহণের কথা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। তাঁর বক্তৃতায় আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর জিকির, সুন্নাহর অনুসরণ এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায় বলে তাঁর পরিচিত মহল জানায়।
জাতীয় ওলামা পার্টির নেতৃত্বে উত্থান:
দ্বীনি অঙ্গনের পরিচিতি থেকেই ধীরে ধীরে তাঁর রাজনৈতিক-সাংগঠনিক ভূমিকার বিস্তার ঘটে। ২০২২ সালে জাতীয় পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাতীয় ওলামা পার্টির কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান তিনি। সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনে জাতীয় ওলামা পার্টির আহ্বায়ক হিসেবে ড. আল্লামা ইরফান বিন তোরাব আলীর নাম উল্লেখ করা হয়েছিল, এমনকি ঢাকার মহানগর সম্মেলনেও তাঁকে উদ্বোধক হিসেবে সম্মানিত করা হয়। জাতীয় পার্টির বিভিন্ন কর্মসূচিতে ওলামা সমাজের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনের যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যেও নিরলসভাবে কাজ করেছেন তিনি।
বরুড়ার রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা:
কুমিল্লার বরুড়া তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। ২০২২ সালের শুরুতে তিনি বরুড়া উপজেলা জাতীয় পার্টির নবনির্বাচিত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান, এরপর কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জাতীয় পার্টির পূর্ণাঙ্গ কমিটিতেও সহসভাপতি হিসেবে তাঁর নাম প্রকাশিত হয়। এভাবেই স্থানীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের ওলামা সংগঠনের নেতৃত্বে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি আরও বিস্তৃত হতে থাকে।
কুমিল্লা-৮ নির্বাচনে লাঙ্গলের প্রার্থী:
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি এবং নির্বাচনী প্রচারণায় স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। এই সময়ে তাঁর প্রচারণাকে ঘিরে একটি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাও সংবাদে আসে প্রতীক বরাদ্দের আগে দলীয় প্রতীকসংবলিত তোরণ নির্মাণের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত তোরণটি অপসারণ করে এবং তাঁকে জরিমানা করা হয়। তবে এই ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক পথচলার একটি ছোট অধ্যায় মাত্র; বরং নির্বাচনী মাঠে তাঁর সক্রিয় ও প্রাণবন্ত উপস্থিতি তাঁকে বরুড়ার রাজনীতিতে আরও দৃশ্যমান ও পরিচিত করে তোলে।
রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক সম্পৃক্ততা:
ইরফান বিন তোরাব আলীর পরিচয়ের আরেকটি উজ্জ্বল দিক তাঁর সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় বরুড়ার পানিবন্দী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি। দুর্যোগের সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এমন মানবিক উদ্যোগ তাঁর জনসম্পৃক্ততাকে আরও গভীর ও অর্থবহ করে তুলেছে।
বক্তৃতা ও দাওয়াতি কর্মকাণ্ডে আলাদা পরিচিতি:
রাজনীতির ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর ধর্মীয় বক্তৃতা ও দাওয়াতি কার্যক্রমের পরিচয়টি অটুট রয়েছে। বিভিন্ন ইসলামি মাহফিল ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্যে আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা, ধর্মীয় অনুশাসন এবং মানবিক মূল্যবোধের বিষয় গুরুত্ব পায়। একজন আলেম হিসেবে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা এবং একজন রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ড এই দুই ধারার সুন্দর সমন্বয় তাঁর ব্যক্তিগত পরিচিতিকে অন্যদের তুলনায় স্বতন্ত্র করে তুলেছে।
দুই অঙ্গনের অভিজ্ঞতায় নির্মিত এক অনন্য পরিচয়:
ইরফান বিন তোরাব আলীর পথচলা মূলত দুটি ভিন্ন জগতের সুন্দর সংযোগের গল্প একদিকে মাদরাসাকেন্দ্রিক দ্বীনি শিক্ষা ও দাওয়াতি জীবন, অন্যদিকে দলীয় রাজনীতি ও নির্বাচনী মাঠ। বরুড়ার স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় ওলামা পার্টির নেতৃত্ব এবং সেখান থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া এই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি।
তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি একজন আলেম ও ধর্মীয় বক্তা, আবার রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি জাতীয় পার্টির একজন সংগঠক ও প্রার্থী। ফলে ইরফান বিন তোরাব আলীর পরিচয় কেবল একটি রাজনৈতিক পদে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দ্বীনি শিক্ষা, বক্তৃতা, সংগঠন এবং জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এই সবকিছুর সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন একান্ত নিজস্ব এক পরিসর, যা তাঁকে বরুড়া তথা কুমিল্লার রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।