নাভানা ফার্মার সাবেক চেয়ারপারসন সাইকা মাজেদের ভয়ংকর জালিয়াতি

মোঃ রায়হান :

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত দেশের অন্যতম শীর্ষ ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি’র সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারপার্সন সাইকা মাজেদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন তিনি। এতে করে একদিকে যেমন তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আইন ভঙ্গ করেছেন। অন্যদিকে করপোরেট সুশাসনের চরম লঙ্ঘন হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, বিএসইসি এক্ষেত্রে শুরু থেকে নিরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, যা পুঁজিবাজারের জন্য অশনি সংকেত বলছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে খাত সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাইকা মাজেদ নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সময় থেকেই সত্য গোপন করে আসছিলেন। বিএসইসি’র ‘কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড, ২০১৮’ অনুযায়ী, একজন স্বতন্ত্র পরিচালক হতে হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সাথে কোনো ধরনের আর্থিক বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। অথচ সাইকা মাজেদ ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সময় একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র জমা দিয়ে দাবি করেছিলেন যে, নাভানা ফার্মার সাথে তার সরাসরি বা পরোক্ষ কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই।

তবে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভিন্ন চিত্র। তদন্তে দেখা যায়, সাইকা মাজেদ তার নিজস্ব অংশীদারি প্রতিষ্ঠান ‘সুইফট লিংক সলিউশন (ট্রেড লাইসেন্স নং: TRAD/DNCC/009441/2023)-এর মাধ্যমে নাভানা ফার্মার সাথে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক লেনদেন চালিয়ে আসছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানটি তার নিয়োগের অনেক আগে থেকেই নাভানা ফার্মার ভেন্ডর হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল। জেনেশুনে এই মিথ্যা তথ্য প্রদান আইনের ভাষায় ‘Void ab initio’ বা শুরু থেকেই অবৈধ বলে গণ্য হয়।

নাভানা ফার্মার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাইকা মাজেদ তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের সাথে মোট ৯ কোটি ৪১ লাখ ৪৭ হাজার ৯৩১ টাকার ব্যবসায়িক লেনদেন করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, তিনি যখন চেয়ারপারসন ও স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নীতিনির্ধারণী পদে আসীন ছিলেন, ঠিক সেই সময়েই (২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে) তার প্রতিষ্ঠান ৩ কোটি ৬২ লাখ ৮ হাজার ২৩৩ টাকা বিল হিসেবে তুলে নিয়েছে। স্বতন্ত্র পরিচালক থাকাকালীন কোম্পানির সাথে ব্যবসা করা বিএসইসি’র বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যা তার পদের নৈতিক ও আইনি ভিত্তিকেই ধুলিসাৎ করে দিয়েছে।

এই জালিয়াতির জাল আরও বিস্তৃত হয়েছে পারিবারিক সম্পর্কের মাধ্যমে। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, সাইকা মাজেদ নাভানা ফার্মার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির হোতা হিসেবে সমালোচিত ডা. জুনাইদ শফিকের আপন খালাতো বোন। কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড অনুযায়ী, কোনো পরিচালকের আত্মীয় স্বতন্ত্র পরিচালক হতে পারেন না। অভিযোগ উঠেছে, ডা. জুনাইদ শফিকের প্রত্যক্ষ সহায়তায় এবং পারিবারিক প্রভাবে সাইকা মাজেদ কেবল পরিচালকই হননি, বরং চেয়ারপারসনের পদ দখল করে লুটপাটের পথ সুগম করেছিলেন। মূলত পারিবারিক এই সিন্ডিকেট কোম্পানিটিকে একটি ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করার চেষ্টা চালিয়েছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই জালিয়াতি ধরা পড়ার পর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি’র ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, জালিয়াতি ও জালিয়াতিপূর্ণ হলফনামা দেওয়ার অপরাধে সাইকা মাজেদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা ফৌজদারি মামলা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে ‘নতুন আবেদন’ চাওয়ার মাধ্যমে বিএসইসি বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার বা অপরাধীকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতে, ফৌজদারি তদন্তাধীন বা অপসারিত কোনো পরিচালকের উপস্থিতিতে হওয়া সভাকে বিএসইসি যখন ‘বৈধ’ বলে স্বীকৃতি দেয়, তখন সেটি মূলত অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়ার শামিল। নাভানা ফার্মার বর্তমান পর্ষদ দাবি করেছে, বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়ে করা পূর্ববর্তী সভার সিদ্ধান্তগুলো কোম্পানির সম্পদের জন্য চরম ক্ষতিকর ছিল।

তদন্তে জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ায় কোম্পানির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। করপোরেট গভর্নেন্স কোড অনুযায়ী সাইকা মাজেদের নিয়োগ অকার্যকর ঘোষণা করা হয়েছে এবং তার স্বতন্ত্র পরিচালকের পদটি তাৎক্ষণিকভাবে শূন্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

ইতিমধ্যে কোম্পানির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ‘প্রি-আইপিও শেয়ার হোল্ডার ডিরেক্টর জাভেদ কায়সার আলীকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ’ দিয়েছে। পাশাপাশি সাইকা মাজেদের স্থলে নতুন স্বচ্ছ ভাবমূর্তির স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের জন্য গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)-এর কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছে।

বর্তমান পর্ষদ জালিয়াতির প্রমাণস্বরূপ ট্রেড লাইসেন্স, ইনভয়েস এবং ব্যাংক স্টেটমেন্ট সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছে জমা দিয়েছে। একই সাথে, বিএসইসি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, এদিকে বর্তমান পর্ষদ উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করেছে।

নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস পুঁজিবাজারের একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত, যা নিয়মিত ১৪ শতাংশ লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড) দিয়ে আসছিল। বর্তমান পর্ষদের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ২০০ কোটি টাকার ব্যাংক লোন পরিশোধ করে একটি স্থিতিশীল আর্থিক অবস্থায় ফিরেছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সাইকা মাজেদ ও তার সহযোগীরা পুনরায় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করলে ৫০০০ কর্মীর রুটি-রুজির সমস্যা হবে।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নুরুল হক বলেন, সাইকা মাজেদ অবৈধভাবে নাভানা ফার্মার পরিচালনা পর্ষদে গিয়েছিল। পাশাপাশি তার ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের সাথে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করেছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই বিষয়গুলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জানানো্ উচিত। কমিশনের উচিত তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

শাকিল রিজভী স্টক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাকিল রিজভী বলেন, সাইকা মাজেদের ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কোনোভাবেই নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন করতে পারে না। যদি লেনদেন করে থাকে তবে আইন ভঙ্গ করেছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া উচিত।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক ও বিএলআই সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের সাবেক চেয়ারপার্সন সাইকা মাজেদের কার্যক্রম ছিল পুরোপুরি ইলিগ্যাল (অবৈধ)। ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের লেনদেন সে কোনোভাবেই করতে পারে না। তার নিয়োগটাই ছিল অবৈধ। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বিএসইসি’র মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, সাইকা মাজেদের বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। কোনো নন কমপ্লায়েন্স খুঁজে পাওয়া গেলে আমাদের এনফোর্সমেন্ট বিভাগ যে অ্যাকশন নেওয়া দরকার তা নেবে। আর এ ব্যাপারে শুরু থেকে বিএসইসি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে। তদন্তাধীন বিষয়ে এর বাহিরে আর কিছু বলা এই মূহুর্তে ঠিক হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *