মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অপারেশনাল, লজিস্টিক, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে নৌবাহিনী পরিচালিত ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড (ডিইডব্লিউ) কর্তৃক নির্মিত ৭০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন অত্যাধুনিক ফ্লোটিং ক্রেন ‘বিএনএফসি বলীয়ান’ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন ২০২৬) অনুষ্ঠিত এক বর্ণাঢ্য হস্তান্তর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্রেনটি নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান। এ সময় নৌবাহিনী সদর দপ্তরের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারগণ (পিএসও), নৌবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ডিইডব্লিউ লিমিটেডের কর্মকর্তাবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর চলমান আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে এবং ভবিষ্যৎ অপারেশনাল চাহিদার কথা বিবেচনা করে দেশীয় প্রযুক্তিতে ফ্লোটিং ক্রেন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সেই উদ্যোগের বাস্তবায়নেই ডিইডব্লিউ লিমিটেডের দক্ষ প্রকৌশলী ও কারিগরদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছে অত্যাধুনিক এই ভাসমান ক্রেন ‘বিএনএফসি বলীয়ান’।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৩০ জুন কিল-লেয়িং অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্রেনটির নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। দীর্ঘ পরিকল্পনা, নকশা প্রণয়ন এবং প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সফলভাবে নির্মাণ সম্পন্ন করে নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।
ফ্লোটিং ক্রেনটির দৈর্ঘ্য ৪৫ মিটার, প্রস্থ ১৫ মিটার এবং গভীরতা ৩ মিটার। এটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৫ মাইল গতিতে চলাচল করতে সক্ষম। আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এই ক্রেন একসঙ্গে ৭০ টন পর্যন্ত ভারী যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম উত্তোলন করতে পারবে, যা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নৌঘাঁটি, জেটি এবং সমুদ্রে অবস্থানরত যুদ্ধজাহাজ ও অন্যান্য নৌযানের ভারী যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন, স্থানান্তর এবং মেরামতের কাজে এই ক্রেন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রকৌশল কার্যক্রম, ভারী মেশিনারি স্থাপন এবং উদ্ধার অভিযানে এটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ‘বিএনএফসি বলীয়ান’ শুধু একটি ফ্লোটিং ক্রেন নয়, বরং এটি দেশের প্রতিরক্ষা খাতে প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। সম্পূর্ণ দেশীয় কারিগরি দক্ষতা, আধুনিক প্রকৌশল জ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে নির্মিত এই প্ল্যাটফর্ম দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
নৌবাহিনী সূত্রে জানা যায়, দেশীয় প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে নির্মিত এ ধরনের সামুদ্রিক প্ল্যাটফর্ম ভবিষ্যতে আরও উন্নত জাহাজ ও সহায়ক নৌযান নির্মাণে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে বিদেশ নির্ভরতা কমিয়ে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ‘বিএনএফসি বলীয়ান’ নৌবাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। কারণ দেশীয়ভাবে এমন অত্যাধুনিক প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং স্থানীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত হবে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত ডিইডব্লিউ ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধজাহাজ, সহায়ক জাহাজ ও সামুদ্রিক প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের মাধ্যমে দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ‘বিএনএফসি বলীয়ান’ সেই ধারাবাহিকতায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দেশীয় প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং আধুনিক প্রকৌশল সক্ষমতার সমন্বয়ে নির্মিত এই ফ্লোটিং ক্রেন ভবিষ্যতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করে তুলবে এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে আত্মনির্ভরতার পথে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।