নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজারবাগে জমি জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালী ও অপ্রতিরোধ্য ভূমিদস্যু রফেজ হাওলাদার গং-এর বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত রফেজ হাওলাদার সম্পত্তির মালিক মোঃ সাইদুল হক গংসহ বহু লোকের কাছ থেকে আমোক্তার নিয়ে প্রতারণামূলকভাবে সম্পত্তি বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তথ্যমতে মান্ডা নিবাসী আবুল কালাম আজাদ গংদের ১০৬৫ নং দাগের ৯০ শতক জমি ভুয়া দলিল করে আত্মসাৎ করেন। এছাড়াও রাজারবাগ মৌজার শাহজানপুরের বেনজিরের সম্পত্তি দলিল জালিয়াতি করে রফেজ ও বারেক হাওলাদার আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীমের কাছে হস্তান্তর করেন। রফেজ হাওলাদার দলিল জালিয়াতি করে সাইনবোর্ড দিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন শাখার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৩০ জন অফিসারের কাছে হস্তান্তর করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, মোঃ সাইদুল হক গং-এর বাবা আব্দুল হক ১৯৬৪ সালে ঢাকার সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ৩৪৮২ নং সাব-কবলামূলে সম্পত্তিটি ক্রয় করেন। পরে মোঃ সাইদুল হক গং-এর নামে এস.এ. নামজারি হয়। কিন্তু বিগত আর.এস. জরিপের সময় নালিশী তফসিল সম্পত্তি আর.এস. ২০৩০ নং খতিয়ানে ভুলক্রমে লক্ষ্মীনারায়ণ দে সরকার গং নামে হাল সাং ভারত পক্ষে, বাংলাদেশ সরকারের নামে আর.এস. রেকর্ড হয়।
এই রেকর্ডের বিরুদ্ধে মোঃ সাইদুল হক গং ঢাকা ৪র্থ সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানি মোকদ্দমা নং ৪৯/২০০১১ দায়ের করেন। ২০১২ সালে নালিশের সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি ‘ক’ তালিকায় প্রকাশিত হলে উক্ত দেওয়ানি মোকদ্দমা অ্যাবেট হয়। পরে মোঃ সাইদুল হক গং ঢাকা জেলা জজ অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যাবর্তন ট্রাইব্যুনাল ঢাকায় অর্পিত মোকদ্দমা নং ১৯৪০/১২ দায়ের করে, ১৯/১১/২০১৯ তারিখে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যাবর্তন ট্রাইব্যুনাল ঢাকা হতে রায় ও ডিক্রি লাভ করেন।
রফেজ হাওলাদার মামলা মোকদ্দমা পরিচালনা করার জন্য আমোক্তারনামা করে প্রতারণামূলকভাবে উক্ত আমোক্তার হস্তান্তর বিষয় লেখেন। রফেজ হাওলাদার ০৪/১০/২০১৮ তারিখের আমোক্তার বলে ১১/১১/২০২৪ ইং তারিখে ১১২৯৫ নং সাব-কবলা দলিলমূলে ৪৯৫ অযুতাংশ সম্পত্তি জাহাঙ্গীরের নিকট বিক্রয় করে এবং একই তারিখে ১১২৯৬ নং সাব-কবলা দলিলমূলে রফেজ হাওলাদার জাহাঙ্গীরের স্ত্রী সেফালী বেগমের নামে বিক্রি করে।
এই ভূমিখেকো রফেজ হাওলাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দলিল জালিয়াতি করে প্রতারণামূলকভাবে আমোক্তারনামা নিয়ে সম্পত্তি হস্তান্তর এবং ভুয়া দলিল তৈরি করে সম্পত্তি বিক্রি করেছেন। ইতোমধ্যে হয়ে উঠেছেন এক অপ্রতিরোধ্য ভূমিদস্যুতে। তার প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক পরিবার আজ নিঃস্ব ও অসহায় জীবনযাপন করছে। তার বিরুদ্ধে থানায় রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।
মোঃ সাইদুল হক গং-এর পক্ষ থেকে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ৫৫ শতাংশ জমি দখল করে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছে বিক্রি করায় রফেজ হাওলাদারের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা দায়ের করা হয়েছে। যাহা ০৪/১০/২০১৮ তারিখের ৮১৮৬ নং রেজিস্টার্ড আমোক্তার দলিল বাতিল বিজ্ঞ সহকারী জজ ৪র্থ আদালত ঢাকা দেওয়ানি মোকদ্দমা নং ৬৬/২০২০ মামলাটি দায়ের করেন। বিজ্ঞ সহকারী জজ আদালত ৪র্থ আদালত বিগত ২৬/০১/২০২৫ তারিখে ৮১৮৬ নং রেজিস্টার্ড আমোক্তার দলিল বাতিল করেন, যাহা পরবর্তীতে ১৬/০২/২০২৫ তারিখে ২৩ নং স্বারকে খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রেরণ করা হয়।
জানা যায়, ২৬/০১/২০২৫ ইং তারিখে সাইদুল হক গং কর্তৃক সম্পাদিত ০৪/১০/২০১৮ ইং ৮১৮৬ নং দলিল বাতিল করেন। বিজ্ঞ সিভিল জজ আদালত নং ১৪ ঢাকা চিরস্থায়ী মোকদ্দমা নং দেওয়ানি নং ০২/২৬ বিচারাধীন থাকা অবস্থায় মহাপরিদর্শক নিবন্ধন (আই.জি.আর) বরাবরে সকল প্রকার দলিল নিবন্ধন স্থগিত করার জন্য ১৩/০১/২০২৬ ইং তারিখে আবেদন করেন।
এলাকাবাসী রফেজ হাওলাদারকে কুখ্যাত ভূমিদস্যু হিসেবে জানেন। তার বিরুদ্ধে কথা বললেই বিভিন্ন হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরদের প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের জিম্মি করে রাখে। তার জাল জালিয়াতি করার মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষের জমি দখল করাকে নেশা ও পেশা হিসেবে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তিনি এলাকাবাসীর জন্য এক ভয়াবহ আতঙ্কে পরিণত হয়েছেন।
এসব বিষয়ে কথা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইদুল হক গং-এর সাথে। তিনি বলেন, আমরা একসময় রফেজ হাওলাদারকে আমোক্তার নিয়োগ করেছিলাম, কিন্তু পরবর্তীতে যখন জানতে পারি সে একজন প্রতারক, জালিয়াত ও ঠকপ্রকৃতির লোক তখন প্রদেয় আমোক্তারনামা প্রত্যাহার করি। তারপরও থামেনি জালিয়াতি। নিজের নামে ভুয়া দলিল বানিয়ে স্ত্রীর নামে দলিল দেয়। স্ত্রী আবার পুলিশসহ বিভিন্ন লোকের কাছে বিক্রি করে। তার এহেন কাজে বহু লোক সর্বশান্ত—আবুল কালাম আজাদ গং ছাড়াও শাহজাহানপুরের বেনজির গং। মূলত তার কাজই এটা—বিভিন্ন লোকের সম্পত্তির জাল দলিল করে বিক্রি করা।
ভুক্তভোগী আবুল কালাম আজাদ বলেন, রফেজ ও তার স্ত্রী খুবই দুষ্ট প্রকৃতির লোক। তারা অন্যের সম্পত্তি জাল জালিয়াতি করে নিজেদের নামে রেকর্ড করিয়ে বিক্রি করে। ১০৬৫ নং দাগে আমাদের ৯০ শতাংশ জমি জালিয়াতি করে বিক্রি করছে। এ ব্যাপারে মামলা চলমান রয়েছে। আমরা এই প্রতারকের কবল থেকে মুক্তি চাই। সরকার যেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
খিলগাঁও সাব-রেজিস্টার বলেন, আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করবো। ভবিষ্যতে রফেজ হাওলাদার এই খতিয়ান থেকে কোনো ধরনের বেচাবিক্রি বা দলিল করতে পারবে না—এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আই.জি.আর বলেন, বিষয়টি যথাযথ গুরুত্বের সাথে দেখবো। এ ব্যাপারে খিলগাঁও সাব-রেজিস্টারের বরাবর একটি দরখাস্ত দিন, যাহাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রকার জালিয়াতি না করতে পারে। তাছাড়া এ ব্যাপারে আমাকে ও দুদককে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছে। দুদক যদি বলে, তাহলে আমি তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেবো।