প্রবীণরা বোঝা নন, দেশের অভিজ্ঞ ও মূল্যবান সম্পদ: প্রবীণবান্ধব রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান

স্টাফ রিপোর্টার:

প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন; তাঁরা একটি দেশের অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও দক্ষতার জীবন্ত ভাণ্ডার। তাঁদের সম্মান, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্বও। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একটি সক্রিয়, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রবীণসমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরামের নেতৃবৃন্দ।

আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরামের উদ্যোগে রাজধানীতে সংক্ষিপ্ত র‍্যালি ও আলোচনা সভায় এ আহ্বান জানানো হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল—‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’।

দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংক্ষিপ্ত র‍্যালি শেষে প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরামের সভাপতি ফেরদৌস আরা বেগম। সভায় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. খবির উদ্দিন ফোরামের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং প্রবীণদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণে সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ, নির্বাহী কমিটি ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনেরা এতে বক্তব্য দেন।

সভায় বক্তারা বলেন, দীর্ঘায়ু শুধু জীবনের বছর বাড়ানোর বিষয় নয়; বরং জীবনের শেষ অধ্যায়কে অর্থবহ, সক্রিয়, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। প্রবীণদের জীবন যেন অবহেলা, অসহায়ত্ব কিংবা একাকিত্বের প্রতিচ্ছবি না হয়, সে জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বক্তারা প্রবীণদের কল্যাণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিশেষ করে বয়স্ক ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, মেট্রোরেল ও ট্রেনে ভাড়া ছাড় এবং দানপত্রের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও দাতার জীবদ্দশায় সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সুরক্ষার উদ্যোগকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সভায় জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ প্রবীণ রয়েছেন। ২০৫০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা প্রায় ৪ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের বাস্তবতা বিবেচনায় প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, আবাসন, পরিবহন এবং পারিবারিক পরিচর্যা নিশ্চিত করতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আলোচনা সভা থেকে সর্বজনীন সিনিয়র সিটিজেন কার্ড চালু, হাসপাতাল, ব্যাংক, সরকারি অফিসসহ বিভিন্ন সেবাপ্রতিষ্ঠানে প্রবীণদের অগ্রাধিকার সেবা নিশ্চিত, গণপরিবহনে ঘোষিত ভাড়া ছাড় কার্যকর ও সম্প্রসারণ এবং জাতীয় প্রবীণ নীতি-২০১৩-এর কার্যকর বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।

একই সঙ্গে প্রবীণদের নির্যাতন, প্রতারণা ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিনোদন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক মিলনকেন্দ্রে প্রবীণদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

বক্তারা বলেন, প্রবীণদের দীর্ঘ কর্মজীবনে অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাঁদের সক্ষমতা অনুযায়ী পরামর্শক, প্রশিক্ষক, মেন্টর ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে শিক্ষা, সমাজসেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করা হলে একদিকে প্রবীণরা সক্রিয় ও আত্মমর্যাদাশীল থাকবেন, অন্যদিকে নতুন প্রজন্ম তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হবে।

সভায় প্রবীণদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি স্বতন্ত্র সেল গঠন, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা ও অগ্রাধিকার নিশ্চিত এবং গণপরিবহনে সম্মানজনক ভাড়া ছাড় ও অগ্রাধিকার আসনের ব্যবস্থা করারও দাবি জানানো হয়।

বক্তারা আরও বলেন, আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো নির্দিষ্ট প্রজন্মের একক দাবি নয়; এটি সরকার, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। পরিবারে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও যত্ন এবং প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের মানবিক বন্ধন আরও দৃঢ় করতে হবে।

আলোচনা সভা থেকে এমন একটি প্রবীণবান্ধব রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়, যেখানে বার্ধক্য অবহেলা, অসহায়ত্ব কিংবা একাকিত্বের প্রতীক হবে না; বরং হবে সম্মান, নিরাপত্তা, সক্রিয়তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি।

‘সক্রিয় প্রবীণ, সুস্থ সমাজ, উজ্জ্বল আগামী’—এই প্রত্যয়ে প্রবীণদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরামের নেতৃবৃন্দ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *