ফতুল্লায় নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘনের হিড়িক

মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী: 

ফতুল্লায় নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা যেন ক্রমেই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। একের পর এক অভিযোগে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো এখন আর গোপনে নয়—বরং প্রকাশ্যেই ঘটছে। তবুও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা প্রার্থীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।

এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার (১৭ জানুয়ারি) ফতুল্লার হরিহর পাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেখা গেছে নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘনের স্পষ্ট চিত্র। পঞ্চবটি এডভেঞ্চার ল্যান্ডে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ শাহ আলম ও মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই অনুষ্ঠানটি ছিল সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলনমেলা। কিন্তু অনুষ্ঠানের আনন্দঘন পরিবেশ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্নিত হয় বলে অভিযোগ করেন উপস্থিত অনেকেই।

প্রকাশ্যে ভোট প্রার্থনার অভিযোগ

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে উপস্থিত দুই প্রার্থী অতিথিদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে ভোট প্রার্থনা করেন। ছবি তোলা, করমর্দন এবং কুশল বিনিময়ের আড়ালে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আলাপচারিতার মধ্য দিয়েই ভোট চাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া একাধিক ব্যক্তি জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমন একটি আয়োজন রাজনৈতিক প্রচারণার জন্য ব্যবহার করা হবে—এটা তারা কল্পনাও করেননি। এতে অনুষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয় এবং অনেক অতিথি বিরক্তি প্রকাশ করেন।

ক্ষোভ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের

একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“নির্বাচনী আচরণ বিধি তো কাগজে-কলমেই আছে। বাস্তবে কেউ মানছে না। অভিযোগ করলেও কোনো পরিবর্তন দেখি না। শাস্তি না হওয়ায় প্রার্থীরা আরও সাহস পাচ্ছে।”

একজন সাবেক শিক্ষার্থী বলেন,
“শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রচারণা অত্যন্ত দুঃখজনক। এখানে রাজনীতি নয়, শিক্ষার পরিবেশ থাকা উচিত।”

অনেক অতিথির মতে, এমন ঘটনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নেতিবাচক বার্তা দেয়।

নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট

স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের প্রকাশ্য আচরণ বিধি লঙ্ঘন নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। তারা বলেন, নিয়ম থাকলেও যদি তার প্রয়োগ না হয়, তাহলে আচরণ বিধির কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

একজন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন,
“নির্বাচনের সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থান ও সরকারি অনুষ্ঠানগুলোকে প্রচারণার বাইরে রাখার বিধান আছে। কিন্তু এসব বিধি বারবার লঙ্ঘিত হলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।”

তাদের মতে, আগাম নজরদারি এবং ঘটনাস্থলেই ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়বে।

প্রশাসনের বক্তব্য

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন,
“জেলার সব আসনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা দায়িত্বে রয়েছেন। কেউ আচরণ বিধি লঙ্ঘন করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে প্রশাসনের এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন, প্রকাশ্যভাবে নিয়ম ভাঙার ঘটনা ঘটার পরও যদি দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে আচরণ বিধির গুরুত্ব কোথায় থাকবে?

জনমনে প্রশ্ন

ফতুল্লাবাসীর এখন একটাই প্রশ্ন—
প্রকাশ্যে নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘনের পরও যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা ও প্রশাসনিক নজরদারির বাস্তব মূল্য কতটুকু?

স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে নিয়ম ভাঙার সংস্কৃতি চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *