ফরিদগঞ্জে হামলার শিকার ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ

মনির হোসেন মিজি:

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার পাটোয়ারী বাজারে এক ব্যবসায়ীকে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর, দোকান ভাঙচুর, ব্যাংকের চেক ও মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার বাদী মো. কামাল হোসেন ওরফে মোস্তফা এবং তাঁর বাবা মিজানুর রহমানের অভিযোগ, হামলার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও তাঁদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও বিভিন্ন পত্রিকায় মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হচ্ছে।

তাঁদের দাবি, বায়না চুক্তির অর্থ ফেরত দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে গত ১২ অক্টোবর তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তাঁরা আইনি প্রতিকার চাইলেও এখন উল্টো তাঁদের বিরুদ্ধে হামলা ও মারধরের অভিযোগ তুলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, মোস্তফার বাবা মিজানুর রহমানের মালিকানাধীন ‘এম আর কে ট্রেডার্স’ নামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দোকান ও ভিটাসহ একটি পাকা বাড়ি ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের জন্য বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ প্রেক্ষাপটে বালিথুবা গ্রামের আবু সাঈদের ছেলে শরিফুল ইসলামের সঙ্গে ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা মোট মূল্যে সম্পত্তি বিক্রির বিষয়ে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর ২ লাখ টাকা বায়না নিয়ে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও শরিফুল ইসলাম সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করে নিতে কালক্ষেপণ করতে থাকেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে মিজানুর রহমান বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে ব্যাংকের ঋণের কিছু অংশ পরিশোধ করেন। তবে জমি ও ভবন বন্ধক রেখে নেওয়া ব্যাংকঋণের বাকি অংশ তখনো চলমান ছিল। এদিকে শরিফুল ইসলামের দেওয়া ২ লাখ টাকা তাঁর ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেওয়া হয় বলে দাবি করেন অভিযোগকারীরা।

বায়নার টাকা ফেরত দেওয়ার পর হামলার অভিযোগ

মোস্তফা ও তাঁর পরিবারের অভিযোগ, বায়নার টাকা ফেরত দেওয়ার পর ক্ষুব্ধ হয়ে গত ১২ অক্টোবর বিকেল ৪টার দিকে ছাত্রনেতা শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল যুবক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের দোকানে হামলা চালায়। এ সময় মোস্তফা বাধা দিলে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে দোকান থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে বাজারের প্রধান সড়কের পাশে একটি বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সেখানে মোস্তফার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয় এবং তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে তাঁদেরও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।

তাঁদের আরও অভিযোগ, হামলাকারীরা দোকানের ডিভিআর ও সিসিটিভি ক্যামেরা, রড মাপার স্কেল মেশিন এবং শাটার ভাঙচুর করে। এ ছাড়া দোকান থেকে নগদ ৮০ হাজার টাকা, স্বাক্ষর করা চারটি চেকের পাতা, একটি ইয়ামাহা মোটরসাইকেল, একটি দামি মুঠোফোনসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে দোকানে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।

ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য প্রচারের অভিযোগ

মোস্তফা ও তাঁর বাবা মিজানুর রহমানের অভিযোগ, ঘটনার পর তাঁদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও বিভিন্ন পত্রিকায় নানা ধরনের কুৎসা ও মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, হামলার সময় তাঁদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে শরিফুল ইসলামের বায়নার ২ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও তাঁরা উল্লেখ করেছেন।

অভিযোগকারীরা বলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে শরিফুল ইসলামের পক্ষের ১০ থেকে ১২ জনকে আহত করার যে দাবি প্রচার করা হচ্ছে, তা সত্য নয়। তাঁদের দাবি, এ ধরনের প্রচারণার সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত চিত্রের মিল নেই।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শরিফুল ইসলাম ও তাঁর পক্ষের অন্যদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।

স্থানীয়দের বক্তব্য

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাটোয়ারী বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী ও পথচারীর সঙ্গে কথা হলে তাঁরা জানান, ঘটনার দিন ব্যবসায়ী মোস্তফা ও তাঁর পক্ষের কয়েকজন আহত হওয়ার খবর তাঁরা জেনেছেন। তবে শরিফুল ইসলামের পক্ষের কেউ আহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন বলে জানান।

তাঁদের দাবি, ১২ অক্টোবর থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত মোস্তফার পক্ষের লোকজন শরিফুল ইসলামের পক্ষের কারও ওপর হামলা করেছেন—এমন কোনো ঘটনা তাঁদের জানা নেই। তবে স্থানীয়দের এসব বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশের বক্তব্য ও মামলার অগ্রগতি

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বোরহানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তাঁর জানা মতে, বিবাদীপক্ষের লোকজন বিভিন্ন মাধ্যমে বর্তমানে যেসব তথ্য প্রচার করছেন, সেগুলোর সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন রয়েছে। ১০ থেকে ১২ জন আহত হওয়ার বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য নেই বলেও তিনি জানান। মামলাটি আইনগত প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

উল্লেখ্য, এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব ও যুগ্ম আহ্বায়কসহ চার নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের (সদর সার্কেল) নেতৃত্বে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে গত ১৪ অক্টোবর রাতে ফরিদগঞ্জ সদর বাজার থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।

ছবির ক্যাপশন: ফরিদগঞ্জের পাটোয়ারী বাজারে ব্যবসায়ী মোস্তফাকে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *