নাসির আহমেদ:
কাজের সন্ধানে বিদেশে গিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে দীর্ঘদিন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী থানার বাগুডাঙ্গা গ্রামের যুবক জনি (৩০)। প্রায় চার মাস থাইল্যান্ডে নির্যাতনের পর তাকে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে পাচারকারী চক্র তাকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে যায়। দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও বিভিন্নজনের সহযোগিতায় অবশেষে শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) অসুস্থ অবস্থায় দেশে ফিরেছেন তিনি। জনির পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় মাস আগে কাজের সন্ধানে তিনি বাংলাদেশ বিমানবন্দরে ঘোরাঘুরি করছিলেন। এ সময় এক অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি বিদেশে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে জনিকে টেকনাফে নিয়ে যান। সেখানে একটি দালালচক্রের কাছে তাকে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে দালালচক্রটি মাছ ধরার একটি নৌকায় করে জোরপূর্বক জনিকে থাইল্যান্ডে নিয়ে যায়। জনি সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জানালে গলায় ছুরি ধরে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। থাইল্যান্ডে নেওয়ার পর শুরু হয় তার ওপর শারীরিক নির্যাতন। পরিবারের কাছে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। কিন্তু পরিবারের পক্ষে এত টাকা দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় জনির ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তিনি সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। পরে তাকে আরও নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রায় চার মাস থাইল্যান্ডে থাকার পর জনিকে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পরও তার ওপর নির্যাতন অব্যাহত ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একপর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন জনি। তার শরীরে পচন ধরতে শুরু করলে পাচারকারী চক্র তাকে আর্থিকভাবে ‘অকার্যকর’ মনে করে। পরে রাতের আঁধারে মালয়েশিয়ার রোহিঙ্গাদের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে তাকে ফেলে রেখে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরদিন স্বাস্থ্যকর্মীরা অসুস্থ জনিকে দেখতে পেয়ে তার পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করেন। পরে বিষয়টি বাংলাদেশ হাইকমিশনকে জানানো হয়। হাইকমিশনের উদ্যোগে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর হেফাজতে জনিকে রাখা হয়।
জনিকে দেশে ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সম্প্রতি কুয়ালালামপুর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করা আরিফুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি জানান, গত ৩১ আগস্ট কাজী সরোয়ার হোসেন ও মতিউর রহমানের ফোনকল এবং হেলাল সিকদারের একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে জনির অসুস্থতার খবর জানতে পারেন। খবর পাওয়ার পর তিনি জনির ছোট ভাই আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে জনির অবস্থান ও তার আশ্রয়দাতার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেন। এরপর যোগাযোগ করে বুকিত মেরতাজামে গিয়ে জনির সঙ্গে সরাসরি দেখা করেন এবং তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন।
আরিফুল ইসলাম চৌধুরীর সহযোগিতায় বিষয়টি বাংলাদেশ হাইকমিশনের নজরে আসে। পরে হাইকমিশনের উদ্যোগে জনির দেশে ফেরার জন্য ট্রাভেল পাসের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি বিশেষ পাস-সংক্রান্ত প্রক্রিয়াতেও সহযোগিতা করা হয়। বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহযোগিতা এবং এলাকার কয়েকজন ব্যক্তির আর্থিক সহায়তায় অবশেষে শুক্রবার জনি দেশে ফেরার সুযোগ পান। দীর্ঘদিন পর স্বজনদের কাছে ফিরে এলেও শারীরিকভাবে এখনো পুরোপুরি সুস্থ নন তিনি। আরিফুল ইসলাম চৌধুরী জানান, একই ঘটনায় চট্টগ্রামের মোশাররফ নামের আরও একজন বাংলাদেশি ভুক্তভোগী রয়েছেন। তার অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ থেকে টেকনাফ হয়ে থাইল্যান্ড এবং পরে মালয়েশিয়ায় কীভাবে জনিকে পাচার করা হলো, কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবং এর পেছনে থাকা চক্রের সদস্যরা কারা—এসব বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, বিদেশে ভালো চাকরি ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশিদের পাচার ও নির্যাতনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। জনির ঘটনা মানবপাচার এবং বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নামে প্রতারণার ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জনির পরিবার ও সংশ্লিষ্টরা।