ভুক্তভোগীর বাসায় গিয়ে ক্ষমা চাইলেন ইউপি সদস্য মঈন উদ্দিন

এ আর সুমন:

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. মঈন উদ্দিনের বিরুদ্ধে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে অকথ্য ভাষায় গালাগাল, দুর্ব্যবহার ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পরদিন ভুক্তভোগীর বাসায় গিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে ভুক্তভোগীর বাড়িতে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন ইউপি সদস্য মঈন উদ্দিন। এর আগে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় অষ্টগ্রাম বড়বাজার এলাকায় ওয়ারিশ সনদ তৈরির জন্য গ্রাম পুলিশের স্বাক্ষরের বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়াকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।

ঘটনার পর একজন জনপ্রতিনিধির আচরণ এবং সাধারণ মানুষের সরকারি সেবা পাওয়ার অধিকার নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তবে পরদিন অভিযুক্ত ইউপি সদস্যের ভুক্তভোগীর বাসায় গিয়ে ক্ষমা চাওয়ার ঘটনায় বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ওয়ারিশ সনদ-সংক্রান্ত একটি জরুরি কাজের জন্য গ্রাম পুলিশের তথ্য যাচাই ও স্বাক্ষরের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট গ্রাম পুলিশ অষ্টগ্রামে না থাকায় তিনি বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়ে জানতে চেষ্টা করেন। পরে জানতে পারেন, গ্রাম পুলিশের মা মারা যাওয়ায় তিনি শেষবারের মতো মাকে দেখতে অষ্টগ্রামের বাইরে অবস্থান করছেন।

এ অবস্থায় জরুরি প্রয়োজনে কীভাবে স্বাক্ষর নেওয়া সম্ভব, তা জানতে ভুক্তভোগী কয়েকবার ইউনিয়ন পরিষদে যান। তবে সেখানে গিয়েও ইউপি সদস্য মো. মঈন উদ্দিনের দেখা পাননি বলে দাবি করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কেনাকাটার জন্য অষ্টগ্রাম বড়বাজারে গেলে ইউপি সদস্যের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। এ সময় সালাম দিয়ে গ্রাম পুলিশ অনুপস্থিত থাকায় ওয়ারিশ সনদের জরুরি কাজটি সম্পন্ন করতে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব কি না, তা জানতে চান তিনি। ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে জানতে চাওয়ার পরপরই ইউপি সদস্য মঈন উদ্দিন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে বাজারে উপস্থিত লোকজনের সামনে তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন এবং মারধর করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।

তিনি আরও দাবি করেন, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অষ্টগ্রাম বড়বাজারে উপস্থিত কয়েকজন এগিয়ে এসে তাঁকে রক্ষা করেন। পরে এক পথচারীর সহায়তায় তিনি বাড়িতে ফিরে যান। এ সময় ইউপি সদস্য তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেন এবং ওয়ারিশ সনদের কাগজপত্র নিয়ে তাঁকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ঘটনার পরদিন শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে ইউপি সদস্য মো. মঈন উদ্দিন ভুক্তভোগীর বাসায় যান এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চান। এর মধ্য দিয়ে আগের দিনের অপ্রীতিকর ঘটনার পর নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

তবে কী কারণে তিনি ভুক্তভোগীর বাসায় গিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন এবং এ সময় তাঁদের মধ্যে কী ধরনের আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। এ বিষয়ে অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবুর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘আজকের আওয়াজ’-কে বলেন, ইউপি সদস্য মঈন উদ্দিনের আচরণ সম্পর্কে তিনি আগে থেকেই অবগত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মঈন উদ্দিনের আচরণ উগ্র ও বদমেজাজি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর দুর্ব্যবহারের বিষয়টিও তিনি জানেন। এ কারণে ব্যক্তিগতভাবেও তিনি মঈন উদ্দিনের সঙ্গে কম কথা বলেন বলে জানান।

চেয়ারম্যান বলেন, জন্মনিবন্ধন, মৃত্যুনিবন্ধন, নাগরিক সনদ ও ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন সরকারি ও স্থানীয় পরিষেবা পাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। একজন ইউপি সদস্য জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি ও সেবক। তাই নাগরিকদের প্রাপ্য সেবা নিশ্চিত করা তাঁর দায়িত্ব। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন নাগরিককে কেন সময়মতো ওয়ারিশ সনদ পেতে সমস্যায় পড়তে হবে এবং কেন তাঁকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

চেয়ারম্যান আরও বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের ঘটনা ইউনিয়ন পরিষদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ তাঁরা প্রত্যাশা করেন না। জনগণের সেবা করার দায়িত্ব যাঁদের ওপর ন্যস্ত, তাঁদের কাছ থেকেই যদি সাধারণ মানুষ অপমান ও দুর্ব্যবহারের শিকার হন, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাঁরা এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা আরও অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন পরিষদের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও ভোগান্তি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে তাঁদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করবেন এবং নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার ও প্রাপ্য সেবা নিশ্চিত করতে আন্তরিকভাবে কাজ করবেন।

তাঁদের মতে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রধান দায়িত্ব হলো জনসেবা করা। তাই কোনো নাগরিক যেন নিজের ন্যায্য অধিকার ও প্রাপ্য সেবা চাইতে গিয়ে অপমান, হয়রানি কিংবা হুমকির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ যেন হয়রানি ছাড়াই সময়মতো তাঁদের প্রাপ্য সেবা পান, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *