ভূমি অফিসে দুর্নীতির খেসারত: কাশিমপুরে সব কর্মকর্তা-কর্মচারী বরখাস্ত, সেবা থেকে বঞ্চিত সাধারণ মানুষ

মোঃ সাইদুল ইসলাম:

গাজীপুরের কাশিমপুর ভূমি অফিসে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পর কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ভূমি অফিসের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা গেলেও, সাময়িকভাবে ভূমি অফিসের কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা।

জানা গেছে, ৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে গাজীপুর জেলা প্রশাসনের নির্দেশে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে নামজারি (মিউটেশন), ভূমি উন্নয়ন কর আদায়, খতিয়ান সংশোধন, বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র প্রদানসহ নানা সেবার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং অনিয়মের অভিযোগ জমা পড়ছিল। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়ায় জেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই ফাইল নড়ত না। দালালদের মাধ্যমে কাজ করাতে বাধ্য করা হতো সেবাপ্রার্থীদের। অনেকের নামজারি আবেদন মাসের পর মাস ঝুলে থাকলেও অতিরিক্ত অর্থ দিলে অল্প সময়েই কাজ সম্পন্ন হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছিলেন।

তবে প্রশাসনের এই অভিযানের পর কাশিমপুর ভূমি অফিসে কার্যত সেবা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। অফিসের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারী একযোগে বরখাস্ত হওয়ায় জরুরি প্রয়োজনেও সেবা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, রেকর্ড সংশোধনসহ বিভিন্ন কাজে এসে অনেকেই অফিস থেকে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।

সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন ছিল। তবে একই সঙ্গে বিকল্প জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষই এখন সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেকের জমি ক্রয়-বিক্রয়ের প্রক্রিয়া আটকে গেছে, ব্যাংক ঋণের কাগজপত্র সম্পন্ন করা যাচ্ছে না, আবার অনেকেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভূমি-সংক্রান্ত কাজ শেষ করতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।

এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল রয়েছে। অভিযোগের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তদন্তও চলবে। একই সঙ্গে দ্রুত বিকল্প কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে কাশিমপুর ভূমি অফিসের সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জনগণের ভোগান্তি কমাতে অস্থায়ীভাবে অন্য ভূমি অফিস থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারী এনে সেবা কার্যক্রম সচল করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। খুব দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশাসনের এই পদক্ষেপ ইতিবাচক এবং এটি অন্যান্য সরকারি অফিসের জন্যও সতর্কবার্তা। তবে একই সঙ্গে জনসেবা যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও প্রশাসনকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে ম্লান হয়ে যেতে পারে।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দ্রুত বিকল্প জনবল নিয়োগের মাধ্যমে ভূমি অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হবে, যাতে জনগণ হয়রানি ছাড়াই প্রয়োজনীয় ভূমি-সংক্রান্ত সেবা গ্রহণ করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *