মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য নিয়ে বাকলিয়ায় দুই পক্ষের সংঘর্ষ

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ সড়কে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত রোববার রাতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনার পেছনে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, জায়গা দখল ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে মো. জসিম একটি পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং তৈরি, জায়গা দখলসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, অপর পক্ষের নেতৃত্বে থাকা মো. মুরাদের বিরুদ্ধেও মাদক, অস্ত্র ও লুটের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুরাদ ও জসিম একসময় একসঙ্গে চলাফেরা করতেন। পুলিশ বলছে, মুরাদের কাছ থেকেই জসিম মাদক ব্যবসায় যুক্ত হন এবং শুরুতে তাঁর কাছ থেকে ইয়াবা নিয়ে বিক্রি করতেন। প্রায় এক বছর আগে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এরপর জসিম অন্য উৎস থেকে মাদক সংগ্রহ করে বিক্রি শুরু করেন এবং এলাকায় নিজের আলাদা একটি বলয় তৈরি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ নিয়ে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, জায়গা দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে বিরোধ আরও তীব্র হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুই পক্ষের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাও যুক্ত রয়েছেন।

রোববার রাতে সৈয়দ শাহ সড়কে দুই পক্ষের লোকজন লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় কয়েকটি বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে দোকানপাট বন্ধ করে দেন ব্যবসায়ীরা। পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারাও নিরাপদ স্থানে সরে যান।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নাছির উদ্দিন বলেন, একসময় মুরাদ ও জসিম একসঙ্গে মাদক কারবার করতেন। মাদকের টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। পরে জসিম আলাদা বলয় গড়ে তোলেন। রোববার রাতে তিনি দুই পক্ষকে লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে সংঘর্ষে জড়াতে দেখেছেন বলে জানান।

পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বাকলিয়ার এই এলাকায় দুই পক্ষের বিরোধ নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তবে রোববার রাতের সংঘর্ষ ছিল তুলনামূলক বড়। স্থানীয়দের দাবি, এতে দুই পক্ষের প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলে অভিযোগ রয়েছে।

মুরাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজেকে চান্দগাঁও থানা যুবদলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। যুবদলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ছবি ও ভিডিওও তাঁর প্রোফাইলে রয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাদক, অস্ত্র ও মালামাল লুটের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আটটি মামলা রয়েছে। দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গত বছরের জানুয়ারিতে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল বলেও পুলিশ জানিয়েছে।

তবে মুরাদ দাবি করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে করা মাদক মামলাগুলো ষড়যন্ত্রমূলক। তিনি বলেন, জসিমের লোকজন বাকলিয়ার ১৫ থেকে ২০টি স্থানে ইয়াবাসহ মাদক বিক্রি করছেন। এসব বন্ধ করতে লোকজন পাঠানো হলে অস্ত্র নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। যুবদলের কোনো পদে না থাকলেও বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন মুরাদ।

নিজেকে নগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হকের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার বিষয়েও মুরাদের বক্তব্য রয়েছে। তবে এমদাদুল হক জানিয়েছেন, মুরাদ তাঁর অনুসারী নন। তাঁর ভাষ্য, কারও অপরাধের দায় দল নেবে না এবং কেউ অপরাধী হলে তাঁর শাস্তি হওয়া উচিত।

অন্যদিকে, জসিমের বিরুদ্ধে মাদকসহ ১২টি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তিনি নিজেকে বাকলিয়া থানা যুবদলের আহ্বায়ক ইসমাইল হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন। তবে ইসমাইল হোসেন বলেন, জসিম তাঁর অনুসারী নন এবং তাঁর সঙ্গে জসিমের কোনো সম্পর্ক নেই।

নগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহেদ বলেন, কোনো অপরাধীর জায়গা যুবদলে নেই। এ বিষয়ে দলের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। কোনো অপরাধীকে দলের কেউ আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর আলম বলেন, মুরাদ ও জসিম দুজনের বিরুদ্ধেই মাদক মামলা রয়েছে। তাঁরা একসময় একসঙ্গে চলাফেরা করতেন। পরে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এলাকায় আধিপত্য, জায়গা দখল ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই তাঁদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

ওসি আরও বলেন, দুজনেরই কিশোর গ্যাং রয়েছে। পুলিশ জসিমসহ তাঁর ১৫ অনুসারীকে গ্রেপ্তার করেছে। মুরাদকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এলাকার বাসিন্দাদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *