মাদক মামলায় দ্রুত জামিন: বরুড়ায় প্রশ্নের মুখে ওসি

মোঃআনজার শাহ :-

মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার ও মামলা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আসামিরা জামিনে বেরিয়ে আসছেন এমন অভিযোগ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার এক যুবক। তাঁর দাবি, মাদকসহ গ্রেপ্তারের পর আসামিরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে যদি আবার একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে মাদকবিরোধী অভিযান কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক।

সম্প্রতি বরুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী নাজমুলের সঙ্গে কথা বলতে মাদকবিরোধী অভিযানের স্পটের বাইরে অপেক্ষা করেন ওই যুবক। ওসি বের হলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও কঠোর করার বিষয়ে নিজের উদ্বেগ ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।

দুই দিনেই জামিন, হতাশ সাধারণ মানুষ:
যুবকটি বলেন, মাদক মামলায় গ্রেপ্তারের পর অনেক ক্ষেত্রে দুই দিনের মধ্যেই আসামিরা জামিনে বেরিয়ে আসেন। এতে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনাকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। তাঁর প্রশ্ন দ্রুত জামিনে বেরিয়ে গেলে মাদকবিরোধী কার্যক্রমের বাস্তব সুফল কতটা পাওয়া সম্ভব?

এ সময় তিনি মাদক মামলায় জামিনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জানান। তাঁর ভাষ্য, যাদের কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হবে এবং যারা মাদক সেবন বা বিক্রির সঙ্গে জড়িত, তাদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের আগে জামিন না দেওয়ার মতো কার্যকর আইন করা হলে মাদক নিয়ন্ত্রণে আরও ইতিবাচক ফল পাওয়া যেতে পারে।

জামিন আদালতের এখতিয়ার: ওসি,
যুবকের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ওসি কাজী নাজমুল বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, পুলিশ গ্রেপ্তারের পর আইন অনুযায়ী আসামিকে আদালতে সোপর্দ করে; এরপর জামিনের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে আদালতের এখতিয়ারাধীন। ফলে আদালতের সিদ্ধান্তের বাইরে পুলিশের নিজস্বভাবে জামিন ঠেকানোর সুযোগ নেই।

ওসির এ বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধু অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে তদন্ত, মামলা, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সর্বশেষে আদালতের সিদ্ধান্তও সরাসরি জড়িত। তাই মাদকবিরোধী লড়াইকে আরও কার্যকর করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রতিনিধি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
যুবকটি মাদকবিরোধী আইন আরও কঠোর করার বিষয়টি মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের নজরে আনারও অনুরোধ জানান। তাঁর প্রত্যাশা, মাদক অপরাধে জড়িতদের দ্রুত জামিনের সুযোগ কমানোসহ কঠোর আইন প্রণয়নে জাতীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

‘প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি একসঙ্গে কাজ করলে মাদক নির্মূল সম্ভব’
মাদকবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে সাংবাদিক মো. আনজার শাহ বলেন, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি একই সুতোয় গাঁথা হয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে, তাহলে বরুড়া থেকে মাদক নির্মূল করা অসম্ভব নয়।

তিনি বলেন, শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে মাদকের বিস্তার পুরোপুরি রোধ করা কঠিন; এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করতে পারেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকবিরোধী মূল্যবোধ তৈরি করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে। এ ছাড়া মসজিদের মিম্বার থেকে কোরআন-হাদিসের আলোকে মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে নিয়মিত আলোচনা এবং ওয়াজ মাহফিলে মাদকবিরোধী বার্তা পৌঁছে দেওয়া হলে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পরিবারের নজরদারিই প্রথম প্রতিরোধ:
সাংবাদিক আনজার শাহের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী করছে এসব বিষয়ে বাবা-মা ও অভিভাবকদের দায়িত্বশীল নজরদারি থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সন্তান মাদকে জড়িয়ে পড়ার পর তাকে ফিরিয়ে আনার চেয়ে শুরুতেই সচেতনতা তৈরি করা অনেক বেশি কার্যকর।

মাদকমুক্ত বরুড়ার প্রত্যাশা:
মাদক একটি পরিবারকে যেমন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে, তেমনি একটি এলাকার সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মাদকবিরোধী অভিযানকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে না দেখে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার দাবি উঠছে।

বরুড়ার ওই যুবকের আকুতি মূলত একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্ন সামনে এনেছে মাদকসহ গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিন পেলে অপরাধ দমনে মানুষের আস্থা কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়? আইন কঠোর করার দাবি, প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা এবং পরিবারের দায়িত্বশীল ভূমিকা সবকিছুর সমন্বয়েই মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে। মাদকমুক্ত বরুড়া গড়তে তাই এখন প্রয়োজন শুধু অভিযান নয়; প্রয়োজন সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *