স্বাধীন আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুদ্ধবিরতির পর ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা আবারও হামাসের দখলে চলে এসেছে। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস গাজার নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদক্ষেপ ইসরাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্যাং ও সহযোগীদের উদ্দেশ্যে একটি সতর্কবার্তা—যারা এখনো যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকায় কার্যত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০-পদক্ষেপের গাজার পরিকল্পনায় উল্লেখ আছে, হামাসের কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক ভূমিকা থাকবে না। তবে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক আজ্জাম তামিমি বলেন,
“হামাস পরাজিত হয়নি। শেষ পর্যন্ত ইসরাইলকে হামাসের সঙ্গে চুক্তি করতে হয়েছে, আর নেতানিয়াহু হামাসকে ধ্বংস করার লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।”
নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ও অভিযান
যুদ্ধবিরতির পর হামাস গাজার সেসব অঞ্চলে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে, যেসব এলাকা থেকে ইসরাইল সেনা সরিয়ে নিয়েছে। হামাস ‘গ্যাং, ত্রাণ লুটপাটকারী ও ইসরাইলের সহযোগীদের’ বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে বহু মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সংঘর্ষে কিছু মানুষ নিহত হয়েছেন। এছাড়া ইসরাইলকে সহযোগিতার অভিযোগে অন্তত ৮ জনকে জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ফিলিস্তিনি বিশ্লেষক মুহাম্মাদ শেহাদা বলেন, হামাসের এসব কার্যক্রম একাধিক উদ্দেশ্য পূরণ করেছে—
-
গাজার অর্থনীতি বিঘ্নিত করা গ্যাংকে নিয়ন্ত্রণ করা,
-
অবৈধ অস্ত্রশস্ত্র অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা,
-
অস্ত্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ফেরত পাওয়া।
শেহাদার মতে,
“হামাসের দ্রুত নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেখিয়েছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের সরানো সহজ হবে না।”
আজ্জাম তামিমি আরও বলেন,
“হামাসই একমাত্র শক্তি, যাকে গাজার মানুষ আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বিশ্বাস করে।”
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও হস্তান্তর
হামাস বহুদিন ধরেই বলেছে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের অস্ত্র হস্তান্তর করবে না। হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাসেম নাইম বলেন,
“কেউ আমাদের অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না।”
হামাসের আরেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজ্জাল জানিয়েছেন,
“অস্ত্র হস্তান্তরের প্রকৃতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেন,
“আপনি যে অস্ত্রত্যাগের কথা বলছেন, তা কী বোঝায়? অস্ত্র কার কাছে হস্তান্তর করা হবে?”
এর আগে আরব কূটনৈতিকরা জানিয়েছিলেন, মধ্যস্থকারীরা হামাসের সঙ্গে আলোচনা করছে যাতে অস্ত্রগুলো আরব শান্তিরক্ষীদের হাতে হস্তান্তর করা যায়।
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ
ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী স্পষ্ট করেছে, শুধু গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের শর্তে তারা যুদ্ধ বন্ধ করবে। হামাসের নেতারা বলেছেন,
“যদি প্রয়োজন হয়, তারা আরও দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালানোর জন্য প্রস্তুত।”
চলতি বছরের শুরুর জরিপে দেখা গেছে, হামাস পশ্চিম তীর ও গাজার কিছু সমর্থন হারিয়েছে। তবে সমর্থন হারানোর পরও তাদের জনপ্রিয়তা প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতাহ–এর চেয়ে বেশি। বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি হামাসের অস্ত্রত্যাগের বিষয়টির বিরোধিতা করে এবং অনেকেই এখনও সশস্ত্র প্রতিরোধে বিশ্বাস রাখে।
শেহাদা বলেন,
“হামাস হলো সরকার, রাজনৈতিক দল, সশস্ত্র প্রতিরোধ দল এবং নাগরিক সমাজের অংশ। মানুষ হামাসের একটি রূপকে সমর্থন করতে পারে, অন্য রূপকে নাও করতে পারে।”
তিনি আরও যোগ করেন,
“হামাস একদিকে জনপ্রিয়, অন্যদিকে অজনপ্রিয়ও। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আকস্মিক হামলা, যুদ্ধ পরিচালনা ও আলোচনা নিয়ে তাদের সমালোচনাও হয়েছে।”
ট্রাম্পের পরিকল্পনা ও হামাসের সীমাবদ্ধতা
‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং হামাস: অ্যান্ড হোয়াই দ্যাট ম্যাটারস’ বইয়ের সহ-লেখক হেলেনা কোব্যান বলেন,
“হামাস ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার শুধুমাত্র প্রথম ছয়টি পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করেছে। বাকি ১৪টি বিষয়ে তারা কিছু বলেনি, কেউ কল্পনা করতে পারবে না যে, ভবিষ্যতে গাজার শাসনে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না।”
কোব্যান আরও বলেন,
“ইসরাইল কেবল হামাস যোদ্ধাদের নয়, বরং গাজার ভিতরে ও বাইরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্বদেরও লক্ষ্য করে যুদ্ধ করেছে।”
এই পরিস্থিতিতে গাজায় হামাসের পুনরায় টহল, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, হামাস এখনও গাজার একমাত্র শক্তিশালী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রভু, এবং ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে না।