যুদ্ধ নাকি সমঝোতা ইরান ইস্যুতে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি ভিন্ন কৌশল বিবেচনা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একদিকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন উপদেষ্টা, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন কেউ কেউ। আবার আরেকটি পক্ষ সরাসরি যুদ্ধ বা চুক্তি—কোনোটিতেই না গিয়ে অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। ফলে ইরান প্রশ্নে ট্রাম্পের প্রশাসনের ভেতরে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের সামনে থাকা তিনটি বিকল্প নিয়ে তাঁর উপদেষ্টারা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। প্রথম বিকল্পের পক্ষে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তাঁরা আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চান।

দ্বিতীয় বিকল্পের পক্ষে রয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তাঁদের অবস্থান হলো, ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করা। তাঁদের মতে, সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো সম্ভব।

তৃতীয় বিকল্পের পক্ষে রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ। তাঁরা আপাতত নতুন করে যুদ্ধ শুরু না করে কোনো চুক্তিতেও না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের পরিকল্পনা হলো, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ ট্রাম্পকে বলেছেন, অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে ইরানের অভ্যন্তরে অস্থিরতা বাড়তে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ বা বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়তে পারে। পর্যবেক্ষকদের একাংশের ধারণা, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে চাপ সৃষ্টি এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধকে জোরালো করাও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের অংশ হতে পারে।

তবে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত কোন পথে এগোবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। গত কয়েক সপ্তাহে তিনি একাধিকবার ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা ও যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, একই সময়ে আলোচনার উদ্যোগও অব্যাহত রেখেছেন তিনি এবং নতুন করে আলোচনার দায়িত্ব দিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে।

এদিকে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরাও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অ্যাক্সিওসের সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা একটি খসড়া চুক্তি তৈরি করেছেন। এতে তিন দিনের মধ্যে কয়েকটি আস্থা তৈরির পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এর মূল লক্ষ্য দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনা পুনরায় শুরু করা। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছেন মধ্যস্থতাকারীরা।

তবে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই সোমবার ইরানের কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সীমিত সামরিক হামলার ধারাবাহিকতায় এটিকে সর্বশেষ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও। এ পরিস্থিতিতে ভোটারদের একাংশ মূল্যবৃদ্ধির জন্য ট্রাম্প প্রশাসনকে দায়ী করছেন। এমনকি মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান দলের কিছু প্রার্থী ও ভোটারের মধ্যেও ট্রাম্পের অবস্থান থেকে দূরত্ব তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাড়াহুড়া করতে চান না বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যেভাবেই হোক, যুক্তরাষ্ট্র কিছু একটা করবে; তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো তাড়া নেই। তাঁর দাবি, অর্থনৈতিকভাবে ইরানকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে এবং দেশটির অর্থ ও জ্বালানি পরিস্থিতি সংকটাপন্ন। এ কারণে ইরানের সাধারণ মানুষও পরিস্থিতিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নির্বাচনের আগে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের চুক্তিতে পৌঁছানোর তাগিদ আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরান এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি চুক্তি করতে আগ্রহী।

সব মিলিয়ে ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের সামনে কূটনৈতিক সমঝোতা, সামরিক অভিযান কিংবা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ—এই তিন পথ খোলা রয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তাঁর সিদ্ধান্ত কোন দিকে যায়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *