সুলতান মাহমুদ:
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জোন-৮ (নারায়ণগঞ্জ)-এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, বৈষম্য এবং দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণের দায়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে ভাঙার চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হলেও, একই অপরাধে অভিযুক্ত অন্য একটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানকে ‘অনৈতিক সুবিধার’ বিনিময়ে ছাড় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন অথারাইজড অফিসার রঙ্গন মন্ডল এবং জোন-৮ এর নবাগত পরিচালক রাজিয়া সুলতানা।
ইয়াশীকে খাঁড়া, সেন্ট্রাল প্লাজাকে সুরক্ষা
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত সেপ্টেম্বর মাসে ‘দপ্তরবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশের পর টনক নড়ে রাজউক কর্মকর্তাদের। লোকদেখানো তৎপরতা হিসেবে অথারাইজড অফিসার রঙ্গন মন্ডল তড়িঘড়ি করে ‘ইয়াশী ট্রেড সেন্টার’কে ১৫ দিনের মধ্যে নকশা বহির্ভূত অংশ ভেঙে ফেলার চূড়ান্ত নোটিশ প্রদান করেন। কিন্তু রহস্যজনকভাবে একই এলাকায় অবস্থিত ‘সেন্ট্রাল প্লাজা’র বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ইয়াশী ট্রেড সেন্টার রাস্তা থেকে ১২ ফুট জায়গা ছেড়ে ভবন নির্মাণ করলেও তাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, প্রভাবশালী আলমগীরের মালিকানাধীন ‘সেন্ট্রাল প্লাজা’ মাত্র ৫-৬ ফুট জায়গা ছেড়ে এবং পার্কিংয়ের জায়গায় গোডাউন ও দোকান ভাড়া দিয়ে আইন ভঙ্গ করলেও রাজউক সেখানে নীরব।
পরিচালক রাজিয়া সুলতানার রহস্যময় নীরবতা
গত মাসে রাজউক জোন-৮ এ পরিচালক হিসেবে যোগদান করেছেন রাজিয়া সুলতানা। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তার কাছে অনিয়ম নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি ‘উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের’ দোহাই দিয়ে তথ্য প্রদানে অস্বীকৃতি জানান। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বসের অনুমতি ছাড়া তিনি মুখ খুলবেন না। এমনকি গণমাধ্যমকর্মীরা কল দিলেও তিনি রিসিভ করছেন না, হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এই নীরবতাকে ‘অনৈতিক লেনদেনের’ সুরক্ষা কবচ হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল।
সেন্ট্রাল প্লাজার ভয়াবহ অনিয়ম
সেন্ট্রাল প্লাজার মালিক আলমগীরের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়। তিনি শুধু সেন্ট্রাল প্লাজাই নয়, আরও দুটি ভবন একইভাবে নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করেছেন। সেন্ট্রাল প্লাজার অবস্থা বর্তমানে ভয়াবহ:
-
পার্কিং উধাও: গাড়ির পার্কিংয়ের জায়গায় গোডাউন বানিয়ে দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
-
পরিবেশ ঝুঁকি: আন্ডারগ্রাউন্ডে বৃষ্টির পানি জমে ড্রেন ও এসিড মশার প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
-
ঘনিষ্ঠতা: অভিযোগ রয়েছে, রাজউক কর্মকর্তাদের সাথে আলমগীরের ‘দহরম-মহরম’ সম্পর্ক থাকায় তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন।
রাজউকের বুদ্ধিতেই ‘রিট’ নাটক!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তাই ভবন মালিকদের শিখিয়ে দেন কীভাবে আইনের ফাঁক গলে বের হওয়া যায়। তাদের পরামর্শেই দুর্নীতিবাজ মালিকরা হাইকোর্টে রিট করে সময়ক্ষেপণ করেন। আর রাজউকের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সেই রিটে কোনো জোরালো বাধা দেন না, যাতে ভবন মালিকরা বছরের পর বছর অবৈধ সুবিধা ভোগ করতে পারেন।
বিচার বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা
ইতিমধ্যেই নকশা বহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে গণপূর্ত সচিব ও উপদেষ্টাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাতীয় ভেজাল প্রতিরোধ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এই অনিয়ম রোধে প্রধান বিচারপতির জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের দাবি, আইনের প্রয়োগ যেন সবার জন্য সমান হয়। ইয়াশী ট্রেড সেন্টারের মতো সেন্ট্রাল প্লাজার বিরুদ্ধেও অবিলম্বে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হোক।