লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত কুয়াকাটা, মুখ থুবড়ে পড়ছে পর্যটন ব্যবসা

মিজানুর রহমান:

সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপরূপ সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। প্রকৃতি ও সমুদ্রের টানে প্রতিনিয়ত হাজারো পর্যটক দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই পর্যটনকেন্দ্রে ভিড় করেন। আগত পর্যটকদের নির্বিঘ্ন সেবা নিশ্চিত করতে নানা উন্নয়নমূলক উদ্যোগ থাকলেও বিদ্যুৎ সরবরাহে নেই কোনো বিশেষ বরাদ্দ বা পৃথক ব্যবস্থা। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন পর্যটক, হোটেল-রিসোর্ট মালিক, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে কুয়াকাটায় প্রতিদিন অন্তত ১৫ থেকে ১৬ বার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এতে প্রায় দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল-মোটেল, শতাধিক রেস্তোরাঁ এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে পর্যটকদের ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে জেনারেটরের অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় কুয়াকাটা সাব-জোনাল অফিস থেকে চারটি ইউনিয়ন ও কুয়াকাটা পৌরসভায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও কুয়াকাটার জন্য আলাদা কোনো বিদ্যুৎ বরাদ্দ বা বিশেষ ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে পর্যটকের চাপ বাড়লেই সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

পর্যটন ব্যবসায়ীদের দাবি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় কুয়াকাটার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অনেক পর্যটক অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। এমনকি বিদ্যুৎ সংকটের কারণে হোটেল বুকিং বাতিলের ঘটনাও ঘটছে।

হোটেল খান প্যালেসের পরিচালক সাকুর বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ১৫ বার লোডশেডিং হয়েছে। বাধ্য হয়ে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে হয়েছে। এতে জ্বালানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। পর্যটকরাও বিরক্ত হচ্ছেন, আর আমাদের লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে।

রাখাইন মার্কেটের রুচিতা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের পরিচালক আবুবকর বলেন, শুধু দিনের বেলায় নয়, রাতেও নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। সোমবার শুধু ব্যবসা সচল রাখতে প্রায় ৩০ লিটার ডিজেল পুড়িয়ে জেনারেটর চালাতে হয়েছে। পুরো রাতে মাত্র আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল। এভাবে একটি পর্যটন এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন।

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক রিফাত বলেন, পরিবার নিয়ে কুয়াকাটায় ঘুরতে এসেছি। কিন্তু বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় স্বস্তিতে থাকা যাচ্ছে না। বিশেষ করে গরমের মধ্যে হোটেলে বিদ্যুৎ না থাকায় খুবই কষ্ট হচ্ছে। একটি পর্যটন এলাকায় এমন পরিস্থিতি মোটেও কাম্য নয়।

এ বিষয়ে কুয়াকাটা বিদ্যুৎ সাব-জোনাল অফিসের ডিজিএম মোস্তফা আমিনুর রাশেদ বলেন, “বর্তমানে আমাদের এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ১১ থেকে ১২ মেগাওয়াট। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে আমরা পাচ্ছি মাত্র ৫ থেকে ৬ মেগাওয়াট। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে কুয়াকাটার জন্য অতিরিক্ত কোনো বিদ্যুৎ বরাদ্দ বা বিশেষ বাজেট নেই। তাই বিদ্যমান সরবরাহ দিয়েই লোড ম্যানেজমেন্ট করতে হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত জানানো হয়েছে এবং অতিরিক্ত বরাদ্দের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “পর্যটনকেন্দ্রটির গুরুত্ব বিবেচনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ বরাদ্দ না পাওয়া পর্যন্ত এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *