শিখ সম্প্রদায়ের ৩২৭তম খালসা সাজনা দিবস উদযাপিত

স্টাফ রিপোর্টার:

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে শিখ সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ‘খালসা সাজনা দিবস’ ও এর ৩২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হয়েছে। গুরুদুয়ারা ম্যানেজমেন্ট কমিটি বাংলাদেশ-এর আয়োজনে গত ২৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই উৎসব সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

খালসা সাজনা দিবস শিখ ধর্মের দশম গুরু শ্রী গুরু গোবিন্দ সিং জ্বী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি ধর্মীয় উৎসব যা দশম শুরু ১৬৯৯ সালে বৈশাখী উৎসবের দিনে আনন্দপুর সাহিব, কেশগড়, পাঞ্জাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এটি শিখদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব, যা ‘খালসা সাজনা দিবস’ নামে পরিচিত। প্রতি বছর বৈশাখ মাসে এটি পালিত হয় যা সাধারণত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে এপ্রিল মাসে পরে।

উৎসব উপলক্ষে নির্ধারিত সময়সূচী অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে গত ২৪ এপ্রিল রাজধানীর নীলক্ষেতস্থ গুরুদুয়ারা নানক শাহী, ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রামের জয়নগরস্থ গুরুদুয়ারা শিখ টেম্পল এস্টেট ও পাহাড়তলী গুরুদুয়ারা, ২৬ এপ্রিল ঢাকার বাংলাবাজারের গুরুদুয়ারা সঙ্গত টোলা এবং ২৭ এপ্রিল ময়মনসিংহের গুরুদুয়ারা গুরু নানক মন্দিরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রতিটি স্থানে শিখ ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ ও প্রত্যক্ষ গুরু ‘শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহিব’ সম্পূর্ণ পাঠ বা ‘সেহেজ পাঠ’ সম্পন্ন করা হয়। ধর্মীয় আচারে কাড়া প্রসাদ ভোগ লাগানোর মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে এবং গুরুদুয়ারাসমূহে শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহিব থেকে গুরবাণী-শাবাদ কীর্তন, ধর্মোপদেশ, আরদাস (প্রার্থনা) ও হুকুমনামা পাঠ করা হয়, যেখানে ওয়াহেগুরু (স্রষ্টার) প্রেরিত ঐশি বাণী শিখ ধর্মের গুরুসাহিব জ্বীর বাণী ও শিক্ষা স্মরণ করা হয়। এই দিনে, যখন খালসা পন্থ প্রতিষ্ঠার প্রহর আসে, তখন ‘পঞ্চ পিয়ারে’ (শিখ ধর্মের পাঁচ প্রিয়জন) ভাই দয়া সিং, ভাই ধরম সিং, ভাই হিম্মত সিং, ভাই মোহকম সিং ও ভাই সাহেব সিং সামনে এগিয়ে যান এবং তখন তাঁদের মাঝে অমৃত সঞ্চার করা হয়।

খালসা পন্থের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গুরু গোবিন্দ সিং জ্বী মূলত তাঁর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি, অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, সত্য ও করুণা প্রতিষ্ঠা এবং সেবার মাধ্যমে মানবতা ও ঐক্যের বার্তা দিয়েছিলেন, যা আজও সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রাসঙ্গিক। এই দিনটি শিখ ধর্মের মানুষের জন্য ঐক্যের প্রতীক, সাহসের প্রতীক, মাথা না নোয়ানোর (শির না ঝুকানো), সংযমের প্রতীক। মূল পাঁচজন প্রিয় ‘পঞ্চ পিয়ারে’ শিখ ইতিহাস গঠনে এবং শিখ ধর্মের স্বরূপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই আধ্যাত্মিক যোদ্ধারা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার অঙ্গীকারই করেননি, বরং মানবসেবার মাধ্যমে বিনয়ের সঙ্গে অন্তর্নিহিত শত্রু-অহংকার-দমনে এবং বর্ণপ্রথা বিলুপ্তির প্রচেষ্টায় নিজেকে নিয়োজিত করার শপথ গ্রহণ করেন। তাঁরাই প্রথম অমৃত সঞ্চার (শিখ দীক্ষা অনুষ্ঠান) সম্পাদন করেন এবং ১৬৯৯ সালের বৈশাখী উৎসবে গুরু গোবিন্দ সিং জ্বীসহ প্রায় ৮০,০০০ জনকে দীক্ষিত করেন।

পঞ্চ পিয়ারের প্রত্যেক সদস্যকে আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় এবং তাঁদের জীবন ও আদর্শ মনোযোগসহকারে অধ্যয়ন করা হয়। পাঁচজন ‘পঞ্চ পিয়ারে’ সকলেই গুরু গোবিন্দ সিং জ্বী ও খালসা বাহিনীর সঙ্গে আনন্দপুর সাহিবের অবরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৭০৫ সালের ডিসেম্বর মাসে চমকৌরের যুদ্ধ থেকে গুরুকে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করেন।

খালসা সাজনা দিবসে বিশেষ লঙ্গর রাখা হয়। যা হলো অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্য গুরুদুয়ারায় নিঃস্বার্থ সেবার মানসিকতা নিয়ে লঙ্গর প্রসাদ পরিবেশন করা হয়। বাংলাদেশে শিখ ধর্মের অনুষ্ঠানাদি গুরুদুয়ারা ম্যানেজমেন্ট কমিটি বাংলাদেশ-এর সভাপতি অমরচাঁন্দ লাল বেগী, সাধারণ সম্পাদক তাপস লাল চৌধুরী এর নেতৃত্বে ও সাম্পারদাই কার সেবা সান্ত বাবা তারা সিং জ্বী প্রতিষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক সান্ত বাবা সুখা সিং জ্বী, বাংলাদেশ গুরুদুয়ারা ম্যানেজমেন্ট বোর্ড, কলকাতা এর সার্বিক সহযোগিতায় এবং বাংলাদেশ ও ভারতের ভক্তবৃন্দের আর্থিক দান-অনুদানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

এবারের বিশেষ আকর্ষণ ছিল সুদূর পাঞ্জাব থেকে জথেদার হারভাজান সিং সান্ধুর নেতৃত্বে আগত ৩৯ জন তীর্থযাত্রীর অংশগ্রহণ। গুরুদুয়ারায় কীর্তন পরিবেশন করেন স্থানীয় কীর্তনীয়ারা। কীর্তনীয়া ডাঃ মৃত্যুঞ্জয় কুমার রায়, দেবাশিষ দাস অপু, শুভাশিষ দাস নূপুর, শিবু দাস, জিতু দাস, মুরলী সিং এবং তবলায় ছিলেন যতন লাল, সত্য দাস, বিক্রম দাস, বিশাল দাস। এছাড়া আরদাস ও হুকুমনামা পাঠ করেন গ্রন্থি জাগপ্রীত সিং।

গুরুদুয়ারা নানক শাহী ঢাকায়, বাংলাদেশ গুরুদুয়ারা ম্যানেজমেন্ট কমিটির উদ্যোগে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও আগত ভক্তবৃন্দদের মাঝে সুপেয় শরবত পরিবেশন করা হয়। সেখানে ফ্রি মেডিকেল সেবা প্রদান করেন গুরুদুয়ারা নানক শাহীর মেডিকেল অফিসার ডাঃ মৃত্যুঞ্জয় কুমার রায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *