
স্টাফ রিপোর্টার:
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় উপজেলা পর্যায়ে ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (টিএসসি) স্থাপন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের একটি চলমান প্রকল্পের কাজ সংসদ সদস্যের মৌখিক নির্দেশনায় বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় সংসদ সদস্য রুহুল আমিন দুলাল প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা পিরোজপুর জেলার এক্সইএন (এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার) জহির উদ্দিনকে ০৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মৌখিকভাবে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। পরে জহির উদ্দিন ০৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার আব্দুস সালামকে কাজ বন্ধ করার মৌখিক নির্দেশ দিলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খান বিল্ডার্স এবং মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ কাজ বন্ধ করে দেয়।
জানা গেছে, টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রকল্পটি ০৯ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৬২৮৬০৭.৮৬০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের কাজের জন্য মেসার্স খান বিল্ডার্স ও মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজের অনুকূলে ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়।
প্রকল্পটির ম্যানেজার আব্দুস সালাম জানান, অবকাঠামো নির্মাণে ইতোমধ্যে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং প্রায় ২০ শতাংশ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ।
এলাকাবাসীর দাবি, গত ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনের সংসদ সদস্য রুহুল আমিন দুলাল প্রতিহিংসার কারণে প্রকল্পটি স্থানান্তরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি জাতীয় সংসদে বলেন, প্রকল্পটি সাবেক সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর বাড়ির নিকটে হওয়ায় এটি স্থানান্তর করা প্রয়োজন।
তবে এ পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা কারিগরি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রকল্প বন্ধের বিষয়ে কোনো লিখিত নির্দেশনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
প্রকল্পের জন্য জমি প্রদানকারী মোট ১০ জন ব্যক্তি ০৮ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে সরকারের নামে জমি রেজিস্ট্রি করে দেন। জমিদাতারা বলেন, তাদের জমিতে প্রকল্পটি স্থাপনের আশায় তারা জমি দিয়েছেন। যদি সরকার প্রকল্পটি স্থানান্তর করে, তাহলে তারা সরকারের কাছে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করবেন।
এদিকে, ০৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জমিদাতা ও স্থানীয় জনগণ প্রকল্প এলাকার সামনের সড়কে প্রায় এক হাজার নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে মানববন্ধন করেন।
মানববন্ধনে জমিদাতা দেলোয়ার হোসেন ও আব্দুস সালাম বলেন, “প্রকল্পটি এখানে বাস্তবায়নের জন্য আমরা জমি সরকারকে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছি। যদি এখান থেকে স্থানান্তর করা হয়, তাহলে আমরা সরকারের কাছে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করবো।”
মানববন্ধনে বিবিএস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী শিক্ষক হামিদুল হক মোল্লা বলেন, “মঠবাড়িয়ার দক্ষিণাঞ্চল, বামনা উপজেলার পশ্চিমাংশ, পাথরঘাটা উপজেলার উত্তরাংশ এবং মঠবাড়িয়া উপজেলার চারটি ইউনিয়নের শিক্ষার্থীরা এ প্রতিষ্ঠানের সুবিধা পাবে। বর্তমানে তাদের প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে পিরোজপুরে কারিগরি শিক্ষার জন্য যেতে হয়, যা ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। তাই কলেজটি এখানে থাকা জরুরি।”
উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাহসিন জামান রোমেল বলেন, “এ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। তাই এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি কলেজটি এখানেই স্থাপন করা হোক।”
স্থানীয়দের মতে, প্রকল্পটির পাশ দিয়ে মঠবাড়িয়া হয়ে পাথরঘাটাগামী একটি কার্পেটিং সড়ক এবং পূর্ব দিকে বামনা হয়ে বরগুনাগামী আরও দুটি সড়ক রয়েছে। এছাড়া পশ্চিম দিকে আমড়াগাছিয়া ইউনিয়ন ও শাপলাজা ইউনিয়নের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত ভালো।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার আব্দুস সালাম বলেন, “প্রকল্পের জন্য রড, সিমেন্ট ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী ক্রয় করে মজুদ রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় এসব নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রকল্পটি অন্যত্র স্থানান্তর করা হলে আমাদের প্রায় ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হবে।”
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি এখানে বাস্তবায়িত হলে মঠবাড়িয়া ছাড়াও আরও তিনটি উপজেলার শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষার সুযোগ পাবে। প্রকল্পের আশপাশের ৮ থেকে ১০টি ইউনিয়নের প্রায় ২ লাখ মানুষ এর সুবিধা পাবে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পটি স্থানান্তর করা হলে সরকার যেমন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে, তেমনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। একই সঙ্গে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে এলাকাবাসী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রকল্পটি স্থানান্তর না করে দ্রুত কাজ পুনরায় শুরুর দাবি জানিয়েছেন।