সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে শিক্ষার্থীরা বাইরে থাকলে জিজ্ঞাসাবাদ: পুলিশ

মো: ফজলুল হক:

মাদক, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসমুক্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া গড়তে সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও অভিযান জোরদারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের বাইরে অবস্থান না করার বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক করা হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে বাইরে অবস্থান করলে পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে বলে জানানো হয়েছে।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার উদ্যোগে পৌর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত মাদকবিরোধী সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন। মাদক, কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাস ও অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।

সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল। তিনি মাদক ও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধু-বান্ধবের বিষয়ে অভিভাবকদের খোঁজখবর রাখতে হবে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে এবং কখন বাড়ি ফিরছে—এসব বিষয়ে পরিবারকে নজরদারি বাড়াতে হবে। অপ্রয়োজনে সন্ধ্যার পর শিক্ষার্থীদের বাইরে না রাখার জন্যও তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান।

সমাবেশে পুলিশ সুপার শাহ মো. আবদুর রউফ বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালনা করে মাদক ও কিশোর গ্যাং নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ জন্য পরিবার থেকেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সন্তানের আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি বলেন, মাদক নির্মূলের প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। এরপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। মাদক কারবারি, কিশোর গ্যাং ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান, সড়ক, মোড় ও আড্ডাস্থলে নজরদারি বাড়ানো হবে। অপ্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের বাইরে অবস্থান, সন্দেহজনক ব্যক্তিদের চলাচল এবং কিশোরদের দলবদ্ধ আড্ডার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক থাকবে। প্রয়োজন হলে পুলিশ ও ডিবি সদস্যরা তাদের পরিচয় ও বাইরে থাকার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।

বক্তারা বলেন, বর্তমানে মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবার ও পুরো সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একইভাবে কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে অল্প বয়সী ছেলেদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। অনেক সময় ছোটখাটো অপরাধ থেকে শুরু করে তারা ছিনতাই, মারামারি, মাদক সেবন ও মাদক কারবারের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই শুরুতেই তাদের নিয়ন্ত্রণে পরিবার ও সমাজকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

সমাবেশে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি মাদক কারবারিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা, সীমান্ত এলাকায় মাদক প্রবেশ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।

সমাবেশ শেষে মাদকমুক্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া গড়ে তুলতে ৬ দফা কর্মপরিকল্পনা ও সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা, কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিকভাবে মাদকবিরোধী আন্দোলন জোরদারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বক্তারা বলেন, শুধু পুলিশি অভিযান চালিয়ে মাদক ও কিশোর গ্যাং নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রত্যেক পরিবারকে সচেতন হতে হবে এবং সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে মাদক, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *