মোঃ আনজার শাহ:
একটি সরকারি হাসপাতাল। রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত, জনগণের সেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সেই হাসপাতালের ভেতরে ঢুকলেই শুরু হয় এক নির্মম লুটপাটের পালা। কেবিনে সিট চাই তো টাকা দাও, ফ্লোর পরিষ্কার চাই তো টাকা দাও, নাস্তা চাই তো টাকা দাও। আর টাকা না দিলে অসুস্থ শিশু পড়ে থাকবে বিছানায়, ইনজেকশন আসবে না, ডাক্তার আসবে না, রিপোর্ট পড়ে থাকবে টেবিলে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আক্রান্ত শিশু ওয়ার্ডে সম্প্রতি পরিচালিত একটি অনুসন্ধানী অভিযানে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ দুর্নীতির এক বিস্ফোরক চিত্র। যা দেখে শিউরে উঠেছেন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।
**ভর্তির আগেই শুরু হয় টাকার খেলা**
অনুসন্ধানী তথ্যচিত্রে হাম আক্রান্ত শিশুদের পরিবারগুলো একের পর এক অভিযোগ তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও কেবিনে একটি সিট পেতে হলে ভর্তির সময়ই আয়ার হাতে গুঁজে দিতে হয় ২০০ টাকা। সপ্তাহে মাত্র একবার ফ্লোর পরিষ্কার করা হলেও প্রতিটি সিটের রোগীর স্বজনকে গুনতে হয় আরও ২০ টাকা। প্রতিদিনের সকালের নাস্তা বাবদ আদায় করা হয় আরও ৩০ টাকা করে। অর্থাৎ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মানেই প্রতিদিন বাড়তি অর্থের বোঝা বহন করা।
এক রোগীর ক্ষুব্ধ স্বজন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমার কাছ থেকে ময়লা পরিষ্কারের কথা বলে ২০০ টাকা নেওয়ার পরও বালতির ময়লা আমাকেই নিজের হাতে পরিষ্কার করতে হয়েছে। আয়ারা টাকা নিয়েছে কিন্তু এক বিন্দু কাজ করেনি। অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে এই নরকযন্ত্রণা আর কতদিন সহ্য করব আমরা।”
**সকালের ইনজেকশন মেলে বিকেলে, রিপোর্ট পড়ে থাকে ডাক্তার আসেন না**
চিকিৎসাসেবায় চরম গাফিলতির এক হৃদয়বিদারক চিত্র তুলে ধরেন আরেক অভিভাবক। তিনি জানান, সকাল ৮টায় দেওয়ার কথা ইনজেকশন। কিন্তু বেলা গড়িয়ে বিকেল ৩টা বেজে গেলেও সেই ইনজেকশন আসেনি। একদিন আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট এসে টেবিলে পড়ে আছে। অথচ সেই রিপোর্ট দেখতে কোনো চিকিৎসক আসেননি, চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। একটি অসুস্থ শিশু শুধু বিছানায় শুয়ে কষ্ট পাচ্ছে আর তার মা অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছেন। এই দৃশ্য দেখলে বুক ফেটে যায়।
**মৃত শিশুর পরিবার ঘুরছে বারান্দায়, মেলেনি মৃত্যুসনদ**
শিশু ওয়ার্ডে চলতি বছরের ৯ এপ্রিল চার বছর বয়সী রিয়াদ নামের একটি নিষ্পাপ শিশু মারা যায়। কিন্তু মৃত্যুর এক মাস আট দিন পরও শিশুটির পরিবার পায়নি মৃত্যুসনদ। পরিবারের স্বজনরা সেই সনদের আশায় হাসপাতালের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরছেন দিনের পর দিন। কেউ সাড়া দিচ্ছেন না, কেউ দায়িত্ব নিচ্ছেন না। একটি শিশুর মৃত্যুর পরও যে প্রতিষ্ঠান তার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে মৃত্যুসনদটুকু দিতে পারে না, সেই প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দেউলিয়াপনা এখন প্রকাশ্যে।
**ইন্টার্ন চিকিৎসকের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি**
অনুসন্ধানকারীরা হাম ওয়ার্ডের ইন্টার্ন চিকিৎসক ফাতেমা তুজ জোহরাকে সরাসরি প্রশ্ন করলে তিনি স্বীকার করেন, “এই অভিযোগগুলো আমিও অনেকদিন ধরে শুনে আসছি। এই অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে।” মৃত্যুর সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি জানান, গত মাত্র এক সপ্তাহেই হাম আক্রান্ত তিনটি শিশু মারা গেছে। একজন কর্মরত চিকিৎসকের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা এই স্বীকারোক্তি পুরো বিষয়টিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
**মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে তিন সূত্রে তিন রকম তথ্য**
হাম ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. আবু হানিফকে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, চলতি বছরের ২৪ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত হাম আক্রান্ত এক হাজার ছয়জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং মারা গেছে আট থেকে নয়জন। অথচ একই হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক বলছেন, শুধু এক সপ্তাহেই মারা গেছে তিনজন। আর বিভাগীয় প্রধান ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ ফোনে জানান, মোট ভর্তি এক হাজার চুয়ান্নজন এবং মারা গেছেন মাত্র চারজন। তিনটি ভিন্ন সূত্রে তিনটি ভিন্ন সংখ্যা। এই তথ্যের অসংগতি প্রমাণ করে হাসপাতালে তথ্য গোপন করার এক সুসংগঠিত প্রচেষ্টা চলছে।
ওয়ার্ডের অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. আবু হানিফ দায় এড়িয়ে বিভাগীয় প্রধানের দিকে প্রশ্ন ঠেলে দেন। আর বিভাগীয় প্রধান ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ অফিসে না থেকে ফোনে বলেন, “এই বিষয়গুলো আমি আপনার মাধ্যমে এখন জানতে পারলাম। জানানোর জন্য ধন্যবাদ, আমি বিষয়গুলো দেখব।” একটি হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান তাঁর নিজের বিভাগে কী ঘটছে, তা সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে জানলেন—এই তথ্যই বলে দেয় হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কতটা ভেঙে পড়েছে।
**বেতন নেই, তাই রোগীর পকেট কাটো—স্বীকার করলেন পরিচালক নিজেই**
সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্যটি দিলেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাহাজান নিজেই। আয়ার বেতন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে আউটসোর্সিং বন্ধ থাকায় ৯০ জন আয়ার বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে ১৫৩ জনের কাজ করছেন মাত্র ৬৩ জন। বাকি ৯০ জন শুধু থাকার জায়গা আর পোশাক পেয়ে কোনো বেতন-ভাতা ছাড়াই কাজ করছেন। তাই তাঁরা হয়তো নানাভাবে রোগীদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন।
পরিচালকের এই স্বীকারোক্তি একটি ভয়ংকর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্র যখন কর্মীর বেতন বন্ধ করে দেয়, তখন সেই কর্মী অসহায় রোগীর পকেট থেকে টাকা তোলে। আর এই পুরো অপরাধচক্রের শিকার হয় একটি মুমূর্ষু শিশু এবং তার সর্বস্বান্ত পরিবার। প্রশাসনিক ব্যর্থতার এই দায় কে নেবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন দেশবাসী জানতে চায়।
**তদন্ত ও বিচার দাবি সচেতন মহলের**
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পাওয়ার পর সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন নাগরিক ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, একটি সরকারি হাসপাতালে যেখানে অসুস্থ শিশু সময়মতো ইনজেকশন পায় না, মৃত শিশুর পরিবার মৃত্যুসনদ পায় না, আয়ারা রোগীর কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করে এবং মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে কর্মকর্তারা পরস্পরবিরোধী তথ্য দেন, সেই হাসপাতালের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অবশ্যকর্তব্য। নিরীহ শিশুদের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলা আর চলতে দেওয়া যায় না।