
জীবন খান : সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাদক কর্মকর্তা মেহেদী হাসান দীর্ঘ সময় ছিলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এডি এডমিন। সেই সুবাদে বিভিন্ন জেলায় জেলায় এবং ঢাকার কোনও অঞ্চলে কোনও পরিদর্শক বা সহকারী পরিচালককে পদায়ন করা হবে তা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ক্যাশিয়ার হিসেবে তিনি এসব বদলী ও পদায়ন করতেন। একই সঙ্গে সাবেক মহাপরিচালক মোস্তাফিজুরের পালিত পূত্র হিসেবেও নিজের পরিচয় দিতেন। সাবেক ডিজি মোস্তাফিজুর আর তারি বাড়ি ছিল একই এলাকায়।
সূত্র জানায়, বদলী ও পদায়ন ছাড়াও রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকার সহকারী পরিচালক ও পরিদর্শকদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিয়ে সেই টাকার একটি অংশ তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালের ধানমন্ডির বাসায় গিয়ে দিয়ে আসতেন। আরেকটি অংশ দিতেন ডিজির কাছে। বাকি অর্থ রাখতেন নিজের কাছে। বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা হিসেবেও প্রভাব খাটাতেন তিনি।
সূত্র জানায়, নিকেতন এলাকার ফু-ওয়াং বারের মালিক নূরুল ইসলাম একজন মাফিয়া। ঢাকায় তার অন্তত পাঁচ-ছয়টি বার রয়েছে। এজন্য নূরুল ইসলামের কাছ থেকে প্রতিমাসে ৩০ লাখ টাকা নেন মেহেদী। এর একটি অংশ ডিজির কাছে পৌঁছে দেন তিনি। এছাড়া গুলশান-বনানী ও উত্তরার অন্যান্য বার থেকেও নিয়মিত মাসোহারা তোলেন তিনি। সংশ্লিস্টরা জানান, শুধুমাত্র গুলশান-বনানীর বারগুলো থেকে প্রতিমাসে কয়েক কোটি টাকা মাসোহারা ওঠে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বারের মালিক এই প্রতিবেদকে বলেন, প্রতি মাসে তার লোক গিয়ে মেহেদীর কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে আসে। টাকা না দিলে নানা ছলছুতায় বারে অভিযান চালানোর হুমকি দেন। এজন্য বাধ্য হয়েই তাকে মাসোহারা দিয়ে আসতে হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, মেহেদী অনেক অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু তিনি অভিযানে যত মাদক জব্দ করেছেন, তার চেয়ে বেশি মাদক ছেড়ে দিয়েছেন অর্থের বিনিময়ে। এই কথা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সবাই জানে, কিন্তু তার ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারে না। তিনি ডিজির প্রভাব খাটিয়ে সবাইকে তটস্থ করে রাখেন।
ওই কর্মকর্তা জানান, যখন যে ডিজি এসেছে, তাকেই ম্যানেজ করে ফেলেছেন মেহেদী। এজন্য চাকরী জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই তিনি ঢাকাতেই কাটিয়েছেন। ঢাকার বাইরে কখনো তার বদলী বা পদায়ন হয়নি। সর্বশেষ পদোন্নতি পেয়ে ঢাকার বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ে যোগদান করেছেন। মাদক কর্মকর্তাদের কাছে এগুলো অনেক বড় প্রাইজ পোস্টিং বা লোভনীয় পদ। এর আগে প্রায় তিন বছর নয় মাস ছিলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোভনীয় পোস্টিং ঢাকা মেট্রো উত্তরের দায়িত্বে।
মাদক সংশ্লিস্ট একজন কর্মকর্তা জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ বদলীতেও কোটি কোটি টাকার বানিজ্য করেছেন এই মেহেদী। বর্তমান ডিজি হাসান মারুফের হয়ে তিনি সবার কাছ পছন্দের জায়গায় বদলী হওয়ার জন্য টাকা তোলেন। বর্তমানে তার অনুসারী হিসেবে পরিচিত পরিদর্শকদের সবাইকে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে পদায়নের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকেও মাসোহারা নিয়ে থাকেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকায় কিংবা ঢাকার বাইরে কোনও জেলায় একটি বারের লাইসেন্স পেতে কয়েক কোটি টাকো ঘুষ দিতে হয়। বারের সঙ্গে ড্যান্স ও গান চালু রাখলে নিতে হয় পৃথক লাইসেন্স। নিজে লাইসেন্স শাখায় না থাকলেও পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করেন মেহেদী।
মেহেদী হাসান, ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যলয়ের উপ-পরিচালক।
কোয়েকার ৪৩ কোটি টাকা লুটপাটেও মেহেদীর নাম
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য-প্রযুক্তিগত আধূনিকায়নের জন্য বিগত সরকারের আমলে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কোরিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন অথরিটির আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত সেই প্রকল্পের পরিচালক অপর একজন কর্মকর্তা থাকলেও তথ্য-প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান আছে এমন কথা বলে নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নেড়েছেন এই মেহেদী। প্রকল্পের প্রায় ৪৩ কোটি টাকা লুটপাটের সঙ্গেও তিনি জড়িত বলে মাদকের সবাই জানে। কিন্তু সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও সাবেক ডিজিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ্য সখ্যতা থাকায় তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
হাদীর খুনী ফয়সালের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা!
সম্প্রতি আলোচিত ওসমান হাদীর খুনি ফয়সাল করিম মাসুদ অভিনীত একটি টিভিসি ভাইরাল হয়েছিল। একটি এজেন্সির মাধ্যমে টিভিসিটি তৈরি করেছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। মেহেদী হাসানই এই ফয়সালকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের টিভিসিতে অভিনয় করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। ফয়সাল মাসুদকে অধিদপ্তরের সেই কোয়েকা প্রকল্পের সফটওয়ার সংক্রান্ত কাজের ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলে তিনি। এছাড়া সিসি ক্যামেরা, বিভিন্ন ডিভাইস এবং ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজগুলোও করতো ফয়সাল করিমম মাসুদ।
সম্প্রতি জুলাই রেভ্যুলেশনারী ঐক্য নামে একটি সংগঠনও এ বিষয়ে অভিযোগ করেছে। কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতাবলে ও অর্থের বিনিময়ে তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জুলাই রেভ্যুলেশনারী ঐক্য’র দাবি অনুযায়ী, মেহেদী হাসানের পরিবার ছিল বরিশালের সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। কিন্তু মেহেদী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে যোগদানের পর আলাদীনের চেরাগ হাতে পেয়ে যায়। মেহেদীর বাবা বরিশালের সাবেক মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহার ব্যবসায়ীক পার্টনার বনে গিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মেহেদী তার অবৈধ আয়ের বেশিরভাগ টাকাই অস্ট্রেলিয়ায় পাচার করেছেন। ব্যানবেস-এ চাকরীরত এক বান্ধবীকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হবার পরিকল্পনাও করেছেন। এছাড়া তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়ায় অবৈধ অর্থের বেশিরভাগ দিয়েই ব্লক চেইনের মাধ্যমে ক্রিপ্টো কারেন্সি কেনায় বিনিয়োগ করে রেখেছেন।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে মেহেদী হাসান স্বীকার করেন, তিনি যা আয় (অবৈধভাবে) করেছেন, তার বেশিরভাগ খরচও করে ফেলেছেন (রেকর্ডেড)। তবে তার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। মেহেদী হাসান ঢাকা ট্রুথকে বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে তার ডিপার্টমেন্টের একটি গ্রুপ তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে।’
মেহেদী হাসান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলা কার্যালয়ে উপ-পরিচালক হিসেবে কর্মরত।
টাকার খনি রাজশাহীর মেহেদীর
রাজশাহীর জেলা মাদক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মেহেদী হাসান যেন ‘টাকার খনি’ পেয়েছিলেন। তার এই টাকার খনির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদকও। কিন্তু টাকা দিয়ে সেই অনুসন্ধানও বন্ধ করার চেষ্টায় আছেন তিনি।
দুদকের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, সাবেক নাটোর জেলা কার্যলয়ের উপ-পরিচালক থাকাকালে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। বর্তমানে তিনি রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক হিসেবে কর্মরত। মেহেদী হাসান ছাড়াও তার স্ত্রী তাসলিমা নাসরিন, তিন সন্তান মোহাইমিন হাসান, মুনতাকিম হাসান ও মুকতাদির হাসানের নামে অবৈধ সম্পদের খোঁজ নেওয়ার জন্য রাজউকসহ অন্যান্য সংস্থার কাছে চিঠি দিয়েছে দুদক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর মেহেদী হাসান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে যোগদান করেন ২০১২ সালে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধান কার্যালয়ে বারের লাইসেন্স প্রদান, বদলি বানিজ্য, নিয়োগ ও পদোন্নতির কাজ করেছেন। সহকারী পরিচালক (গবেষনা ও প্রকাশনা) হয়েও সহকারী পরিচালক (লাইসেন্স) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। কোটি টাকার নিচে বারের লাইসেন্স সংক্রান্ত কোনও ফাইল ছাড়তেন না তিনি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাবেক ডিজি খন্দকার রাকিবুর রহমানের ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিতি ছিল তার। বদলি বাণিজ্য থেকে শুরু করে নিয়োগ ও পদোন্নতির বিনিময়ে টাকা তুলতেন তিনি। সেই টাকার একটি অংশ দিতেন ডিজির কাছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকার বাইরে বগুড়া ও গাজীপুরেও চাকরী করেছেন এই মেহেদী হাসান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এই মেহেদী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। গাজীপুরে থাকাকালীন তিনি মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিতেন। তার হয়ে টাকা তুলতো এএসআই জামির। বগুড়ায় থাকাকালীন মাসোহারার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ঝামেলাও হয়। সেসময় প্রভাব খাটিয়ে তাদের বরখাস্তও করান।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, গাজীপুরে থাকাকালীন একবার মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা চাঁদা তুলে অর্ধেক মেরে দিয়ে বাকি অর্ধেক দিয়ে একটি পিকনিকের আয়োজন করেন। অর্ধেক টাকার ভাগাভাগি নিয়ে তৎকালীন সহকারী পরিচালক বাবুল সরকারের সঙ্গে তার বিরোধ হয়। পরে তিনি বাবুল সরকারকে অন্যত্র বদলী করে দেন। সম্প্রতি সেই বাবুল সরকার নিজেই এক নারী নিয়ে ইয়াবা সেবন করছেন এমন ছবি ভাইরাল হয়েছে।
সূত্র জানায়, মেহেদী হাসানের স্ত্রীর নামে মিরপুরের বেনরসী পল্লীতে দুটি দোকান রয়েছে। মিরপুর ডিওএইচএস আবাসিক এলাকায় প্রায় দুই হাজার স্কয়ারফিটের একটি ফ্ল্যাট ও মিরপুর-১২ তে একটি সতের শ’ স্কয়ারফিটের দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে।
দুর্নীতি ও অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও প্ হাসান সাড়া দেননি। তাকে হোয়াটস অ্যাপে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনও উত্তর দেননি। পরে নিজেই যোগাযোগ করে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন।