সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে অনিয়মের পাহাড়: দুই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রায় দুই কোটি টাকা ফেরতের নির্দেশ

স্টাফ রিপোর্টার:

ঢাকার নিউ বেইলি রোড এলাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়–এ ব্যাপক আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদনে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেন এবং সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সাহাব উদ্দিন মোল্লার বিরুদ্ধে প্রায় এক কোটি ৭৭ লাখ টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেন অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণসহ বিভিন্ন খাতে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ৮০ লাখ ২৮ হাজার ৬১২ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সাহাব উদ্দিন মোল্লার বিরুদ্ধে প্রায় ৯৭ লাখ ১৯ হাজার ৮৮ টাকা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ তহবিলে জমা না দিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে ব্যয় বা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। উভয়কেই ওই অর্থ প্রতিষ্ঠানের সাধারণ তহবিলে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আয়-ব্যয়ের তথ্যে গুরুতর অসামঞ্জস্যতা থাকায় সংশ্লিষ্ট দুই প্রধান শিক্ষককে ব্রডশিট জবাবের মাধ্যমে বিস্তারিত ব্যাখ্যা জমা দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি পরিচালনা কমিটির নজরে আনা হয়েছে এবং স্বচ্ছ হিসাব নিরীক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্তে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ, নিয়োগ প্রক্রিয়া, ক্রয় কার্যক্রম এবং উন্নয়ন ব্যয় ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়ম বিদ্যমান। নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র ও ক্রয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসরণ না করেই বিভিন্ন কেনাকাটা ও ব্যয় সম্পন্ন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন উৎসব, জাতীয় দিবস ও অভ্যন্তরীণ অনুষ্ঠান আয়োজনের নামে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা হয়েছে, যার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানে স্টক রেজিস্টার সংরক্ষণ না থাকায় বিপুল পরিমাণ কেনাকাটার প্রকৃত হিসাব যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া শিক্ষা সফর ও অন্যান্য খাতের অর্থের সঠিক নথিপত্রও পাওয়া যায়নি।

ক্রয় কার্যক্রমে একাধিক অনিয়মের উদাহরণও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। যেমন, ২০২১ সালে ১২০ জোড়া বেঞ্চ ক্রয়ের বিল কেবল প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষরে সম্পন্ন হয়েছে, কোনো কমিটির সদস্যের অনুমোদন নেই। একইভাবে বাথরুম নির্মাণের বিলেও একক স্বাক্ষরের মাধ্যমে অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক নিয়মের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করা হয়।

পরীক্ষার কাগজপত্র ও স্টেশনারি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও অসামঞ্জস্যতা ধরা পড়ে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক খাতে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হলেও কয়েকদিনের ব্যবধানে ভিন্ন ভাউচারে আবার ২০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় দেখানো হয়, যা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আইসিটি খাতেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। ৩০টি সিসি ক্যামেরা ক্রয় ও পরবর্তীতে মেরামতের নামে কয়েক দফায় অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও প্রকৃত ক্যামেরার সংখ্যা ও অবস্থান সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। একই খাতে বারবার ব্যয় দেখানোকে সন্দেহজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

তদন্তে আরও উঠে আসে, বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যেমন নিউ মধুমিতা মিষ্টি ঘর ও এস.কে. এন্টারপ্রাইজকে নগদে বড় অঙ্কের অর্থ প্রদান করা হয়েছে, যার যথাযথ বিল ও যাচাইযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি। এসব ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে নিরীক্ষা দল।

প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অডিট ব্যবস্থার দুর্বলতাও প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা না থাকায় আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত হয়নি এবং বহু বছর ধরে চলমান অনিয়মগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করা হয়।

তহবিল ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষিত তহবিলে প্রায় ২১ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার ৩১৭ টাকা জমা রয়েছে। তবে সাধারণ তহবিলের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অস্পষ্টতা রয়েছে এবং ভবিষ্য তহবিল ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা হয়নি।

শিক্ষক-কর্মচারীদের ভবিষ্য তহবিল (প্রভিডেন্ট ফান্ড) চালুর বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে আর্থিক স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।

মামলা সংক্রান্ত তথ্যেও অস্পষ্টতা পাওয়া গেছে। তদন্তকালে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষক বাদী হয়ে মামলা করলেও সংশ্লিষ্ট নথি ও রেকর্ডপত্র উপস্থাপন করা হয়নি, যা প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সংক্রান্ত তথ্যেও কোনো বড় ধরনের অনিয়ম পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হলেও ভবিষ্যতে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের তথ্য যথাযথভাবে শিক্ষা কর্তৃপক্ষকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ডিআইএ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানে অতীতে কোনো পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা কার্যক্রম কার্যকরভাবে হয়নি, ফলে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মগুলো আড়ালেই থেকে গেছে। এই কারণে পুরো হিসাব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

সবশেষে তদন্ত দল সুপারিশ করেছে যে, সংশ্লিষ্ট সকল অনিয়মের বিষয়ে বিস্তারিত ব্রডশিট জবাব গ্রহণ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি পরিচালনা কমিটিকে সক্রিয়ভাবে তদারকি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা প্রশাসনের এই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)–এর ভূমিকা নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে নজরদারির অভাব এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ছে।

এদিকে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ও সাবেক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে স্থানীয়ভাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সঠিক ব্যবস্থা নিলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ফিরে আসবে, আবার অনেকে মনে করছেন বিষয়টি আরও গভীরভাবে নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়–এর এই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এখন শিক্ষা প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *