নিজস্ব প্রতিবেদক:
জুলাই আন্দোলনে গুলিতে স্বামী মো. ইসমাইল নিহত হওয়ার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন স্ত্রী লাকি বেগম। তাঁর দাবি, গুলিতে স্বামীর মাথার খুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে মগজ বেরিয়ে এসেছিল। সারা শরীর ছিল রক্তাক্ত। মরদেহের মাথায় ব্যান্ডেজ করানোর পর গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার পথে পুলিশ ও বিজিবির বাধা এবং হেনস্তার শিকার হতে হয়েছিল তাঁদের।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর একক বেঞ্চে বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর সামনে জবানবন্দি দেন লাকি বেগম। রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চারজনের বিরুদ্ধে তিনি ১৬তম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন।
৩৮ বছর বয়সী লাকি বেগমের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায়। বর্তমানে তিনি রাজধানীর রামপুরা এলাকায় বসবাস করেন। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে তাঁর স্বামী ইসমাইল নিহত হন।
জবানবন্দিতে লাকি বেগম বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেল ৩টার দিকে অটোরিকশা চালানোর জন্য বাসা থেকে বের হন তাঁর স্বামী। মাগরিবের নামাজের সময় ছেলের এক বন্ধু এসে জানান, ডেলটা কেয়ার হাসপাতালের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইসমাইল মারা গেছেন। খবরটি শুনে তিনি ও তাঁর ছেলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
পরে জ্ঞান ফিরে তিনি দেখেন, এক প্রতিবেশী ভ্যানে করে তাঁর স্বামীর মরদেহ বাসায় নিয়ে এসেছেন। লাকি বেগমের ভাষ্য, গুলিতে স্বামীর মাথার খুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে মগজ বেরিয়ে গিয়েছিল। মাথায় গুলি লাগায় তাঁর পুরো শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়।
তিনি জানান, মরদেহের মাথায় ব্যান্ডেজ করানোর জন্য তাঁরা বেটার লাইফ হাসপাতালে নিয়ে যান। ব্যান্ডেজ না করায় মরদেহ নড়াচড়া করানো কঠিন হচ্ছিল। হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় গ্রামের বাড়িতে মরদেহ নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। পরে তাঁর দেবর অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করেন। এরপর তিনি, তাঁর ছেলে ও নিকটাত্মীয়রা মরদেহ নিয়ে গ্রামের উদ্দেশে রওনা হন।
লাকি বেগমের অভিযোগ, পথে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা তাঁদের বাধা দেন এবং অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখেন। ইসমাইল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন—এমন কথা বলার পর তাঁদের গ্রামে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও জানান, ২০ জুলাই গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে স্বামীকে দাফন করা হয়। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে ইসমাইল নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় বিজিবির রেদোয়ান ও রাফাত এবং পুলিশের রাশেদুল ও মশিউরের নাম উল্লেখ করেন তিনি। জবানবন্দির একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে স্বামী হত্যার বিচার দাবি করেন লাকি বেগম।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান ও মামুনুর রশিদ। এ সময় প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার, মঈনুল করিমসহ অন্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন।