হরমুজে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ পিছু হটেছে, জয় দাবি ইরানের

অনলাইন ডেস্ক:

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার মধ্যে নিজেদের অবস্থানকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে ইরান। তেহরানের দাবি, প্রণালির আশপাশে কয়েকটি জাহাজে হামলা চালানোর পর মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের উপকূল থেকে আরও দূরে সরে গেছে।

ইরানের দাবি অনুযায়ী, এসব হামলার মধ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজও ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের এসব দাবির বিষয়ে বিস্তারিত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪ সেপ্টেম্বর হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একটি জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আট মার্কিন মেরিন সদস্য ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়ার কারণে অসুস্থ হন। তাঁদের কয়েকজনের মস্তিষ্কে আঘাতের আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে।

পেন্টাগনের যুদ্ধাহত সেনাসদস্যদের তালিকায় এর আগে ২৯ জন নাবিক ও ৮ জন মেরিন কোর সদস্যের নাম যুক্ত করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর ফলে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর আহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা ৮৬১ জনে দাঁড়িয়েছে। এ পর্যন্ত অন্তত ১৯ জন নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।

তবে এসব তথ্যের বিষয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কাছে জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো মন্তব্য করেনি।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সরে যাওয়ার দাবি

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সরকারসংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো আগের অবস্থান থেকে পিছিয়ে গেছে। এর আগে এসব জাহাজ ইরানের চাবাহার বন্দর ও ওমান উপসাগরের প্রবেশমুখের কাছাকাছি অবস্থান করছিল বলে ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তাদের দাবি, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকি এড়াতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো এখন আরব সাগরের আরও গভীর অংশে অবস্থান করছে।

সোমবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির একটি বার্তা প্রকাশ করা হয়। সেখানে তিনি মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোর গতিবিধির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘যখনই তারা সেই ঝুঁকি নিয়েছে, তখনই নিজেদের জন্য ক্ষতি ডেকে এনেছে। আর শিগগিরই আরব সাগরও তাদের থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।’

হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন অব্যাহত

সামরিক উত্তেজনা থাকলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন বেড়েছে। যদিও যুদ্ধের আগে এই জলপথ দিয়ে যে স্বাভাবিক গতিতে জাহাজ চলাচল করত, সেই পরিস্থিতি এখনো ফিরে আসেনি।

মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হচ্ছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের হিসাব আরও বেশি—তাঁর মতে, প্রতিদিন ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে যাচ্ছে।

যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।

এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

বিকল্প ব্যবস্থায় তেল পরিবহন

কেপলারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৭৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন হয়ে থাকতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, গত সপ্তাহে ১৯টি তেলবাহী ট্যাংকার প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে ১৭টি ছিল অতি বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ বা ভিএলসিসি।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় আরব দেশগুলো বিকল্প ব্যবস্থায় নিজেদের তেল ওই অঞ্চল থেকে বাইরে পাঠাচ্ছে। এ কাজে মার্কিন বাহিনী নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছে বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।

কিছু জাহাজ তাদের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে ওমানের উপকূল ঘেঁষে চলাচল করছে। প্রণালির বাইরে গিয়ে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের পর আবার তেল সংগ্রহের জন্য জলপথে ফিরে আসার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অবরোধ ও তেল রপ্তানি নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, মার্কিন অবরোধের কারণে ইরান তেল রপ্তানি করতে পারছে না। তাঁর হিসাবে, সমুদ্রে আগে থেকে মজুত থাকা প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল তেল ইরানের হাতে রয়েছে, যা সম্ভবত দুই সপ্তাহের মধ্যে চীনে পাঠানো হতে পারে।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক সক্ষমতার বিষয়টি সামনে আনছে ইরান। তেহরানের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্র যাতে অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রেখে একই সঙ্গে হরমুজে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে না পারে।

ক্রাইসিস গ্রুপের ইরানবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় আরও হামলার আশঙ্কা রয়েছে।

আলোচনা চলছে, উত্তেজনাও অব্যাহত

হরমুজ প্রণালি নিয়ে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা না করে জুনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক এবং ওমানের সঙ্গে চূড়ান্ত করা হরমুজ চুক্তিকে ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চায় তারা। এসব উদ্যোগে হরমুজ প্রণালি থেকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ও রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক চাপ, তেল পরিবহন এবং কূটনৈতিক তৎপরতা—তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান সামরিক চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা দেখিয়ে নিজেদের অবস্থানকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। তবে প্রণালির সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *