মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো শ্মশান ও মন্দিরের উন্নয়ন কাজ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান আইনি জটিলতার অবসান ঘটেছে। আদালত আম্বার পেপার মিলস কর্তৃক দাখিল করা অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন খারিজ করে দেওয়ায় শ্মশানের উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আর কোনো আইনি বাধা নেই বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো. সাখাওয়াত হোসেন খান।
রবিবার (২১ জুন) নারায়ণগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালতের বিচারক শারমিন আক্তার পিংকি এ রায় প্রদান করেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্মশান কমিটির সদস্যরা।
শতাব্দী প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সিদ্ধিরগঞ্জের আজিবপুর এলাকায় অবস্থিত এই শ্মশান ও মন্দিরটি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে একটি ঐতিহ্যবাহী ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, প্রায় ১৭৯৩ সাল থেকে এটি শেষকৃত্যসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ১০ নম্বর ওয়ার্ড এবং পার্শ্ববর্তী সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর ও মদনগঞ্জ এলাকার হাজারো হিন্দু ধর্মাবলম্বীর শেষকৃত্য সম্পন্ন করার প্রধান স্থান হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।
বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু জমির মালিকানা
বিরোধের মূল বিষয়টি প্রায় ৭ একর জমির মধ্যে শ্মশান ও মন্দিরের জন্য ব্যবহৃত ৩১ শতাংশ জায়গাকে ঘিরে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই স্থানে শ্মশান ও মন্দিরের অস্তিত্ব থাকলেও একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান পুরো জমির মালিকানা দাবি করে আসছিল।
অন্যদিকে শ্মশান কমিটির দাবি, ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহৃত এই ধর্মীয় স্থাপনার অংশকে গোপন রেখে জমির মালিকানা দাবি করা হয়েছে, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল।
উন্নয়ন প্রকল্প ও কাজ বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে প্রায় ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে শ্মশানটির আধুনিকায়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় আধুনিক দাহ চুল্লি, গোসলখানা এবং অফিস ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল।
উন্নয়ন কাজ শুরু হওয়ার পর একাধিক পাইলিং পিলার স্থাপন করা হলেও পরবর্তীতে আদালতের স্থিতাবস্থা আদেশের কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি হয়।
আদালতের রায়ের পর নাসিক প্রশাসকের বক্তব্য
রায়ের পর নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো. সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। ফলে শ্মশানের উন্নয়ন কাজ চালিয়ে যেতে আর কোনো আইনি বাধা নেই।
তিনি আরও বলেন, জনস্বার্থ এবং স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবি আদালত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আবারও প্রমাণিত হয়েছে।
প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়া ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ
মামলার বাদীপক্ষ আম্বার পেপার মিলসের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মজিদ খন্দকার বলেন, তারা প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র আদালতে উপস্থাপন করেছেন এবং এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি জানান, আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তাদের অবস্থান তুলে ধরা হবে এবং আইনি লড়াই অব্যাহত থাকবে।
ঐতিহাসিক জমি ও অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে দাবি
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, এরশাদ সরকারের আমলে মাত্র এক টাকায় প্রায় ৭০০ শতাংশ জমি স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল আম্বার পেপার মিলসকে। বর্তমানে ওই এলাকার বাজারমূল্য অনুযায়ী সম্পত্তিটির মূল্য শত কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে শ্মশান কমিটির অভিযোগ, ১৯৮৯ সালে লিজ গ্রহণের সময় শ্মশানের ৩১ শতাংশ জমির বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করা হয়েছিল, যা তদন্তের দাবি রাখে।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
আদালতের সর্বশেষ রায়ের পর স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা আশা করছেন, দীর্ঘদিনের এই জমি বিরোধের অবসান ঘটবে এবং শ্মশান আধুনিকায়ন প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন হবে।
স্থানীয়দের মতে, এই রায় শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্পকে এগিয়ে নেবে না, বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক ও ধর্মীয় চাহিদারও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।