মোঃ আনজার শাহ:
সময় থেমে থাকে না, কিন্তু কখনো কখনো একটি প্রতিশ্রুতি বছরের পর বছর ধরে মানুষের বুকের ভেতর নিভু নিভু প্রদীপ হয়ে জ্বলতে থাকে। সোনাইমুড়ীর মানুষের জন্য তেমনই এক প্রদীপ ছিল এ.কে.এম আবু তাহের হাসপাতাল প্রায় তিন দশক আগে যে স্বপ্নের বীজ বোনা হয়েছিল একখণ্ড দানের জমিতে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে সেই স্বপ্ন বাস্তবের মুখ দেখতে চলেছে। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর চালু হতে যাচ্ছে ২০ শয্যার এই হাসপাতাল।
এলাকাবাসীর সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এ ঘোষণা দিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। তিনি জানান, তাঁর প্রয়াত পিতা এ.কে.এম আবু তাহের প্রায় ৩০ বছর আগে এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবার কথা ভেবে এ জমি দান করেছিলেন। কিন্তু সরকারি উদ্যোগের অভাবে দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়িত হয়নি। অবশেষে পিতার সেই অসমাপ্ত স্বপ্নই পূরণ করতে চলেছেন সন্তান।
মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দল-মত-নির্বিশেষে এলাকার প্রতিটি মানুষ এই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাসেবা পাবেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো দেয়াল এখানে থাকবে না।
২৩ সেপ্টেম্বর থেকে বহির্বিভাগ, বছরের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম
আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর হাসপাতালের বহির্বিভাগ (আউটডোর) কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানান মন্ত্রী। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের কাজও এগিয়ে চলেছে সমান তালে। চলতি বছরের মধ্যেই হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। বর্তমানের ২০ শয্যা আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
উপজেলাতেই মিলবে ৯০ শতাংশ রোগীর সমাধান:
শুধু একটি হাসপাতাল নয়, স্বাস্থ্যসেবার পুরো মানচিত্র বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন মন্ত্রী। তাঁর নির্বাচনী এলাকার ৩০ শয্যার একটি হাসপাতালকে উন্নীত করা হচ্ছে ১৫১ শয্যায়, যেখানে থাকবে আইসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউ, ডায়ালাইসিস সেন্টার, থেরাপি সেন্টার, মা ও শিশুর জন্য পৃথক কর্নার এবং বয়স্কদের জন্য ফিজিওথেরাপি সুবিধা।
লক্ষ্য একটাই প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীর চিকিৎসা যেন উপজেলা পর্যায়েই নিশ্চিত হয়, জটিল রোগ ছাড়া কাউকে যেন জেলা শহর বা রাজধানীর দিকে ছুটতে না হয়।
সচেতনতাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের ঢাল:
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী জানান, প্রতি শনিবার সরকারি উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দিলেই এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকানো সম্ভব এই সম্মিলিত সচেতনতাই পারে ডেঙ্গুকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
সারের মজুতদারিতে কড়া নজর:
কৃষি প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, প্রতিটি ইউনিয়নে নতুন সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, প্রতিটি ডিলারের অধীনে থাকবেন চার-পাঁচজন সাব-ডিলার। কেউ সার মজুত করার চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি, নিশ্চিত করেন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার।
যুদ্ধের আঁচ বিদ্যুতেও, ভরসা সূর্যালোক:
আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব যে ঘরের চৌকাঠ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তার প্রমাণ দিলেন মন্ত্রী নিজেই। ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকায় বেড়েছে জ্বালানির দাম, বন্ধ রাখতে হয়েছে দেশের কয়েকটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার নিয়েছে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে যাঁরা নিজ বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসাবেন, তাঁদের কাছ থেকে পরবর্তী তিন বছর প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কিনে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সচ্ছল পরিবারগুলোকে নিজ উদ্যোগে সোলার প্যানেল বসানোর আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার।
বিদেশের বাজারে দক্ষ হাত পাঠাতে কারিগরি প্রশিক্ষণ
তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিশ্চিতে তলাগ্রামে একটি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার কথা জানান মন্ত্রী। এসএসসি-এইচএসসি পাসের পর যাঁরা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী নন, তাঁরা কারিগরি দক্ষতা ও বিদেশি ভাষা শিখে জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মসংস্থানের দরজা খুলতে পারবেন। জাপানি ভাষায় নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জনকারীদের শুরুতেই মাসিক এক থেকে দেড় লাখ টাকা বেতনের চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। প্রতিটি গ্রাম থেকে পর্যাপ্তসংখ্যক তরুণ দক্ষ হয়ে বিদেশে পাড়ি জমালে এলাকার দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে মনে করেন মন্ত্রী।
মাদকের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইন:
মাদক নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে জাকারিয়া তাহের সুমন জানান, মাদকবিরোধী আইনে যুক্ত করা হয়েছে মৃত্যুদণ্ডের বিধান। একই সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রশাসন আরও কার্যকরভাবে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে পারে।
শান্তির পথেই উন্নয়নের গন্তব্য:
বক্তব্যের শেষ প্রান্তে এসে উন্নয়নের পাশাপাশি শান্তি ও শৃঙ্খলার গুরুত্বও তুলে ধরেন গৃহায়ণমন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, উন্নয়ন যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন শান্তিপূর্ণ পরিবেশও। সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় আগামী পাঁচ বছরে গত ১৫ বছরের তুলনায় আরও বেশি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।