৫৫ বছর ধরে কলম দিয়ে রাষ্ট্র গড়েছেন, এবার কলম তুলেছেন নিজের অধিকারের জন্য, রাজপথ সাংবাদিকদের চরম হুঁশিয়ারি

মোঃআনজার শাহ

যে কলম দিয়ে তারা দেশের ইতিহাস লেখেন, দুর্নীতির মুখোশ উন্মোচন করেন, অসহায় মানুষের কান্না পৌঁছে দেন রাষ্ট্রের দরবারে আজ সেই কলম হাতে নিয়েই রাজপথে নেমে এলেন বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ। কারণ একটাই ৫৫ বছরেও রাষ্ট্র তাদের দিকে ফিরে তাকায়নি, তাদের ন্যায্য অধিকার আজও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ, বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও নেই।

জাতীয় গণমাধ্যম সপ্তাহ উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় এক ঐতিহাসিক দাবি সমাবেশ। দেশের ৬৩ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুটে আসা হাজারো সাংবাদিকের পদচারণায় প্রকম্পিত হয়ে ওঠে প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ। সমাবেশে নেতারা রাষ্ট্রের উদ্দেশে এমন বজ্রকণ্ঠে কথা বললেন, যেন প্রতিটি শব্দ ছিল দশকের পর দশক ধরে জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ।

ক্ষোভের  পুড়ছে প্রেসক্লাব চত্বর,
সমাবেশে সাংবাদিক নেতারা বলেন, এই দেশের সাংবাদিকরা সবসময় রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। গণতন্ত্রের সংকটে কলম ধরেছেন, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বুক পেতে দিয়েছেন, দেশের মানুষের কথা বলতে গিয়ে জেল খেটেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, এমনকি জীবনও দিয়েছেন। অথচ প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় এসে সাংবাদিকদের গলায় ‘জাতির বিবেক’-এর মালা পরিয়েছে, আর পেছন দিয়ে তাদের অধিকার হরণ করে গেছে নিরবচ্ছিন্নভাবে।
নেতারা ক্ষোভের সাথে বলেন, “৫৫ বছরের ইতিহাসে সাংবাদিকদের অধিকার তো দূরের কথা, তাদের মর্যাদার কথা বলারও সুযোগ দেওয়া হয়নি। প্রতিটি সরকার তাদের ফুলেল বক্তৃতায় ঘুম পাড়িয়েছে, প্রতিশ্রুতির আফিম খাইয়েছে। কিন্তু এবার আর সেই ফাঁদে পা দেওয়া হবে না, এবার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবেই।”

রাষ্ট্র নীরব কেন? সরাসরি প্রশ্নের মুখে সরকার,
সমাবেশে বক্তারা তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দেন রাষ্ট্রের দিকে। তারা বলেন, এই রাষ্ট্র চিকিৎসকের জন্য বিএমডিসি করেছে, আইনজীবীর জন্য বার কাউন্সিল করেছে, প্রকৌশলীর জন্য আইইবি করেছে। সমাজের প্রতিটি পেশার মানুষের মর্যাদা ও জীবিকা রক্ষায় রাষ্ট্র সচেষ্ট। কিন্তু যে সাংবাদিকরা রাষ্ট্রের আয়না হয়ে থাকেন, সমাজের পচন ধরানো জায়গাগুলো চিহ্নিত করেন, জনগণ ও সরকারের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করেন তাদের বিষয়ে রাষ্ট্র আজও সম্পূর্ণ নীরব। এই নীরবতা কি অবহেলা, নাকি ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা সেই প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে।

নেতারা কড়া ভাষায় বলেন, “প্রধানমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রী যদি সত্যিই গণমাধ্যম উন্নয়ন চান, তাহলে ঢাকার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে মুষ্টিমেয় এলিট সাংবাদিকদের পরামর্শ নিলে চলবে না। আপনাদের সরাসরি আসতে হবে, ৬৩ জেলার সেই সাংবাদিকদের কথা শুনতে হবে, যারা বন্যার পানিতে ডুবে রিপোর্ট করেন, যারা রাতের অন্ধকারে মফস্বলের ঘটনা কভার করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নেন, যাদের মাস শেষে বেতনের নিশ্চয়তা নেই।”

অতীতের আইনি ফাঁদ আর চলবে না কঠোর সতর্কবার্তা,
সমাবেশে নেতারা অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, গত কয়েক দশকে একাধিক সরকার সাংবাদিকদের ‘সুরক্ষার’ নাম করে এমন আইন তৈরি করেছে, যে আইন আসলে সাংবাদিকদের কণ্ঠকেই শৃঙ্খলিত করেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইনের আঘাতে সাহসী সাংবাদিকরা কারাগারে গেছেন, পরিবার নিয়ে রাস্তায় পড়েছেন। সেই অন্ধকার অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, এই সরকারকে সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে।

সাংবাদিক নেতারা আরও বলেন, “গণমাধ্যমকে পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেলে সাংবাদিকরা শ্রম আইনের সুরক্ষা পাবেন, নিয়মিত বেতন পাবেন, চাকরির নিরাপত্তা পাবেন। এটি কোনো বিলাসিতার দাবি নয় এটি একটি সভ্য রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব।” পাশাপাশি দশকের পর দশক ধরে অকার্যকর হয়ে পড়ে থাকা প্রেস কাউন্সিলকে আমূল সংস্কার করে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার দাবিও জোরালোভাবে উঠে আসে।

তথ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে আশার আলো, তবে সময়ক্ষেপণ নয়,
সমাবেশে নেতারা স্বীকার করেন যে বর্তমান তথ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের তালিকা প্রণয়ন ও সুরক্ষা আইনের বিষয়ে ইতিবাচক কথা বলেছেন, সাংবাদিক নিয়োগ নীতিমালার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এটিকে তারা আশার আলো হিসেবে দেখলেও একই সাথে সতর্ক করে দেন “সাত বছর ধরে তালিকা তৈরির কথা বলে বিগত সরকার শুধু সময় নষ্ট করেছে। এই সরকার যেন সেই পথে না হাঁটে। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে এবং সংসদে এই বিষয়গুলো উত্থাপন করে আইনি রূপ দিতে হবে।”

নেতারা তথ্য কমিশন গঠন করে গণমাধ্যম ও সাংবাদিক সংগঠনকে নিবন্ধনের আওতায় আনার দাবিও জানান। তারা বলেন, গুজব ছড়িয়ে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে একটি শক্তিশালী তথ্য কমিশন অপরিহার্য এবং এই কমিশনই হবে সাংবাদিকতার মান নিয়ন্ত্রণের মূল প্রতিষ্ঠান।

১৪ দফা দাবি রাষ্ট্রের কাছে সাংবাদিক সমাজের ঐতিহাসিক দাবিনামা
সমাবেশ থেকে সরকারের প্রতি অবিলম্বে ১৪ দফা দাবি বাস্তবায়নের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। দাবিগুলো হলো :-
১. জাতীয় গণমাধ্যম সপ্তাহের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান
২. পেশাদার সাংবাদিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন ও প্রকাশ
৩. সাংবাদিক নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন
৪. সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন
৫. গণমাধ্যমকে পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে ঘোষণা
৬. প্রেস কাউন্সিলের আমূল সংস্কার ও আধুনিকায়ন
৭. তথ্য কমিশন গঠন ও গণমাধ্যম সংগঠনের নিবন্ধন নিশ্চিতকরণ
৮. সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন কাঠামো নির্ধারণ
৯. সাংবাদিক নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান
১০. মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ
মফস্বল সাংবাদিক নেতারা বলেন, “এই দাবিগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক নতুন সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হবে। আর যদি এবারও উপেক্ষা করা হয়, তাহলে আন্দোলন আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হবে।”

যাঁরা নেতৃত্বে ছিলেন,
বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফর-এর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক জোট মহাজোটের সদস্যসচিব ও বাংলাদেশ এডিটর্স ফোরামের মহাসচিব মো. ওমর ফারুক জলাল, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য মোস্তাক আহমেদ খান, জাতীয় মানবাধিকার সংস্থার সেক্রেটারি জেনারেল মঞ্জুর হোসেন ঈশা, টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরামের সেক্রেটারি জেনারেল কবি অশোক ধর, আরজেএফের চেয়ারম্যান জাহিরুল ইসলাম, সাংবাদিক সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের মহাসচিব সুজন মাহমুদ, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সমিতির সভাপতি আবু বকর সিদ্দিকী, ইউনাইটেড জার্নালিস্টস অ্যালায়েন্সের সভাপতি মিজানুর রহমান মোল্লা, বাংলাদেশ মহিলা সাংবাদিক সমিতির চেয়ারম্যান বিথী মোস্তফা, বাংলাদেশ সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরামের সভাপতি আবুল হোসেন এবং সাংবাদিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি গাজী মামুনসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শীর্ষ সাংবাদিক নেতারা।
মিছিলে একটাই স্লোগান ‘অধিকার দাও, নইলে রাজপথ ছাড়ব না’
সমাবেশ শেষে এক বর্ণাঢ্য ও তেজোদীপ্ত মিছিল বের হয়। মিছিলে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের কণ্ঠে একটাই স্লোগান বারবার উচ্চারিত হয় “অধিকার দাও, মর্যাদা দাও, নইলে রাজপথ ছাড়ব না।” মিছিলটি রমনা পার্ক পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়।

সমাবেশে উপস্থিত সাংবাদিকরা একমত হয়ে ঘোষণা দেন রাষ্ট্র যদি এবারও বধির সেজে থাকে, তাহলে এই আন্দোলনের আগুন শুধু প্রেসক্লাব চত্বরে নয়, ছড়িয়ে পড়বে সংসদ ভবনের দোরগোড়া পর্যন্ত।
সাংবাদিক সমাজের এই ঐতিহাসিক জাগরণ কি রাষ্ট্র অনুভব করতে পারছে? এই প্রশ্নের জবাব এখন সরকারের হাতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *