স্টাফ রিপোর্টার:
পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে স্ত্রীকে মারধর, মানসিক নির্যাতন এবং একপর্যায়ে এক কাপড়ে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নুর আহমেদ (৪২) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
দীর্ঘদিন ধরে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের পাশাপাশি ব্যবসার কথা বলে স্ত্রীর কাছ থেকে প্রায় ছয় ভরি স্বর্ণালংকার নেওয়া এবং পরে অনলাইন জুয়ায় অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্বামী নুর আহমেদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেছেন স্ত্রী রোকসানা আকতার (৪১)। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ নথি কাবিননামা সাবেক স্ত্রীকে বুঝিয়ে না দিয়েই নুর আহমেদ দ্বিতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ ঘটনায় নিজের বৈবাহিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাদী রোকসানা আকতার।
আদালতে দায়ের করা অভিযোগ অনুযায়ী, নুর আহমেদের সঙ্গে রোকসানা আকতারের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। কাবিননামা অনুযায়ী, তাদের দেনমোহর নির্ধারণ করা হয় তিন লাখ টাকা। এর মধ্যে এক লাখ টাকা উসুল এবং দুই লাখ টাকা বকেয়া থাকার কথা কাবিননামায় উল্লেখ রয়েছে। বাদীর অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন সময় যৌতুকের জন্য তাকে চাপ দিতে থাকেন তার স্বামী। পিত্রালয় থেকে টাকা এনে দেওয়ার জন্য তাকে নানাভাবে মানসিক চাপ দেওয়া হতো। একপর্যায়ে সেই চাপ শারীরিক নির্যাতন পর্যন্ত গড়ায়। সংসার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা এবং পারিবারিক সম্মানের কথা চিন্তা করে দীর্ঘদিন তিনি স্বামীর নির্যাতন সহ্য করে আসছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতে দেওয়া অভিযোগে রোকসানা আকতার বলেন, তার স্বামী বিভিন্ন সময় ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলে তার কাছ থেকে স্বর্ণালংকার নেন। এসব স্বর্ণালংকারের পরিমাণ প্রায় ছয় ভরি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বামীর প্রতি বিশ্বাস রেখে সংসারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি নিজের স্বর্ণালংকার দিয়ে সহযোগিতা করেন বলে দাবি করেন বাদী। তবে পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, স্বামী অনলাইন জুয়ায় আসক্ত এবং নিয়মিত অনলাইন জুয়ায় অর্থ ব্যয় করতেন। জুয়ায় অর্থ হারানোর পর আবারও তার কাছে টাকা দাবি করা হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, পিত্রালয় থেকে টাকা এনে দেওয়ার জন্য তাকে চাপ দেওয়া হতো। টাকা দিতে না পারলে স্বামী তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে সর্বশেষ ঘটনার তারিখ হিসেবে ১৯ মার্চ ২০২৬-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই দিন রাত আনুমানিক ৮টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানাধীন আশরাফ আলী রোডের ড্রামপট্টি এলাকার আবদুল গনি ম্যানশনের চতুর্থ তলায় স্বামীর বাসায় ঘটনাটি ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন রোকসানা।
বাদীর অভিযোগ, ওই সময় নুর আহমেদ তাকে পিত্রালয় থেকে ব্যবসার প্রয়োজনে পাঁচ লাখ টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ দেন। এত বিপুল পরিমাণ টাকা তার পরিবারের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানালে স্বামী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, পাঁচ লাখ টাকা এনে দিতে না পারলে তাকে স্বামীর সংসারে থাকতে দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়। এ সময় রোকসানা তার ওপর এমন চাপ প্রয়োগের প্রতিবাদ করলে নুর আহমেদ তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে তাকে জোরপূর্বক এক কাপড়ে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তিনি অসহায় অবস্থায় স্বামীর বাসা থেকে বের হয়ে পিত্রালয়ের আশ্রয় নেন বলে দাবি করেছেন।
স্বামীর সঙ্গে বিরোধ মীমাংসার আশায় রোকসানা আকতার ১ এপ্রিল ২০২৬ চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে আবেদন করেন। তার আবেদনের পর বিষয়টি আপস-মীমাংসার লক্ষ্যে মধ্যস্থতা কার্যক্রমে নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার প্রতিবেদনে দেখা যায়, আবেদনকারী রোকসানা আকতার এবং প্রতিপক্ষ নুর আহমেদের মধ্যে পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে এডিআর কার্যক্রম শুরু হয়।
লিগ্যাল এইডের নথিতে আবেদনকারীর নাম রোকসানা আকতার এবং প্রতিপক্ষের নাম নুর আহমেদ উল্লেখ রয়েছে। আবেদনটি গ্রহণের পর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় প্রতিপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়। মধ্যস্থতার জন্য একাধিক তারিখ নির্ধারণ করা হলেও প্রতিপক্ষ যথাযথভাবে উপস্থিত না হওয়ায় সমঝোতার উদ্যোগ সফল হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, লিগ্যাল এইডের দ্বিতীয় হাজিরার দিনও অভিযুক্ত নুর আহমেদ উপস্থিত না হয়ে উল্টো দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন বলে বাদীপক্ষ অভিযোগ করেছে। নথিতে বলা হয়েছে, আবেদনকারী হাজির থাকলেও প্রতিপক্ষ বিনা তদবিরে অনুপস্থিত ছিলেন। প্রতিপক্ষ বারবার অনুপস্থিত থাকায় বিরোধটি আপসের মাধ্যমে মীমাংসা করা সম্ভব হয়নি। পরে এডিআর কার্যক্রম নিষ্পত্তি করা হয়।
মধ্যস্থতা কার্যক্রমের মোট সময়কাল ১০৩ দিন বলে লিগ্যাল এইডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যস্থতা ব্যর্থ হওয়ার প্রতিবেদন স্বাক্ষর করা হয় ১২ জুলাই ২০২৬। বাদীর আদালতে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, লিগ্যাল এইড অফিস থেকে প্রথমে প্রতিপক্ষকে নোটিশ দিয়ে ৯ জুন ২০২৬ তারিখে হাজির হতে বলা হয়। কিন্তু ওই তারিখে নুর আহমেদ হাজির হননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এরপর পুনরায় নোটিশ প্রদান করে ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করা হয়। বাদীপক্ষের অভিযোগ, দ্বিতীয় নির্ধারিত তারিখেও প্রতিপক্ষ হাজির হননি। ফলে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ আর তৈরি হয়নি। লিগ্যাল এইডের প্রতিবেদনে প্রতিপক্ষের অনুপস্থিতির কারণে মধ্যস্থতা কার্যক্রম ব্যর্থ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে বাদী ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় আদালতের শরণাপন্ন হন।
এদিকে, অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কাবিননামা। বাদীর দাবি, তার সঙ্গে সম্পাদিত বিয়ের কাবিননামা তাকে যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। অথচ ওই কাবিননামায় দেনমোহরের পরিমাণ তিন লাখ টাকা এবং উসুল ও বকেয়া অর্থের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। বাদীপক্ষের অভিযোগ, বৈবাহিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ নথি কাবিননামা সাবেক স্ত্রীকে না দিয়েই নুর আহমেদ নতুন করে বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ অবস্থায় নিজের বৈবাহিক অধিকার, দেনমোহর এবং অন্যান্য আইনগত বিষয় নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন রোকসানা। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিরোধের আইনগত নিষ্পত্তি না করে এবং কাবিননামা সংক্রান্ত বিষয় পরিষ্কার না করেই দ্বিতীয় বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তবে দ্বিতীয় বিয়ের প্রস্তুতি বা এ সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে নুর আহমেদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বাদীপক্ষের দাখিল করা কাবিননামার তথ্য অনুযায়ী, তাদের বিয়েতে দেনমোহর নির্ধারণ করা হয় তিন লাখ টাকা। এর মধ্যে এক লাখ টাকা উসুল এবং দুই লাখ টাকা বকেয়া থাকার তথ্য নথিতে রয়েছে। বাদীর অভিযোগ, দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে আর্থিক চাপের মধ্যে রাখা হলেও তার বৈবাহিক অধিকার ও দেনমোহরের বিষয়টি যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা হয়নি। এ কারণে আদালতের কাছে ন্যায়বিচারের পাশাপাশি তার প্রাপ্য আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যাশা জানিয়েছেন তিনি।
মামলার সঙ্গে বাদীপক্ষ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি সংযুক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাদীর জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, কাবিননামার সত্যায়িত অনুলিপি এবং চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার প্রতিবেদন। এসব নথির মাধ্যমে বাদীপক্ষ তার অভিযোগের পক্ষে প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপন করেছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগে বাদীপক্ষের সাক্ষী হিসেবে রোকসানা আকতার ছাড়াও সাদ্দাম হোসেন ও আবুল হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আরও সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিতে পারেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বাদীপক্ষের অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামি যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন, অর্থ দাবি এবং ঘর থেকে বের করে দেওয়ার মতো অপরাধ করেছেন। এ কারণে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ধারায় তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়েছে। বাদীপক্ষ আদালতের কাছে অভিযোগটি আমলে নিয়ে আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের প্রতিবেদনে বিরোধটির ধরন হিসেবে ‘পারিবারিক’ উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সুব্রত দাসের নামও নথিতে রয়েছে। আবেদনকারীর পক্ষ থেকে মধ্যস্থতা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া হলেও প্রতিপক্ষ বারবার অনুপস্থিত থাকায় সমঝোতার উদ্যোগ সফল হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনগত সহায়তার মাধ্যমে একটি পারিবারিক বিরোধ আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির যে সুযোগ ছিল, প্রতিপক্ষের অনুপস্থিতির কারণে সেটি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি বলে নথি থেকে ধারণা পাওয়া যায়। এরপর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সমাধান না পাওয়ায় বাদী আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, স্বামীর সঙ্গে সংসার করার সময় তিনি একাধিকবার আর্থিক ও মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়েছেন। নিজের স্বর্ণালংকার পর্যন্ত সংসারের প্রয়োজনে দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বরং নতুন করে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ।
সবশেষে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার পর লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। এখন আদালতের মাধ্যমে নিজের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন রোকসানা।
একই সঙ্গে সাবেক স্ত্রীর কাবিননামা না দেওয়া এবং দ্বিতীয় বিয়ের প্রস্তুতির অভিযোগটি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে এই ঘটনায় শুধু যৌতুকের অভিযোগই নয়, দাম্পত্য সম্পর্ক, দেনমোহর, কাবিননামা এবং দ্বিতীয় বিয়েকে ঘিরেও একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। বাদীপক্ষের প্রত্যাশা, আদালত নথিপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অন্যদিকে, থানাহাজতে থাকায় অভিযুক্ত নুর আহমেদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।