সংস্কারের আড়ালে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে বালুর স্তুপ

মাহমুদা আক্তার নাঈমা: 

সংস্কারের নামে দীর্ঘদিন ধরে বেহাল দশায় পড়ে থাকা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) একমাত্র খেলার মাঠটি বহুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় এই খেলার মাঠটিতে সবুজ ঘাসের বদলে দেখা মেলে সারি সারি বালুর স্তূপের। যার ফলে গত কয়েক মাস ধরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, আড্ডা ও নিয়মিত অনুশীলন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রায় আট মাস আগে সংস্কারের কাজ শুরু হলেও, কাজের চরম ধীরগতির কারণে তা এখনও শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার উপযোগী হয়ে ওঠেনি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে কেবল বালুর স্তূপ, নেই সংস্কারের ছোঁয়া। সবুজে ঘেরা চিরপরিচিত খেলার মাঠে এমন বালুর স্তূপ জমায় শিক্ষার্থীরা এটিকে আখ্যা দিচ্ছেন ‘বালু খেকো মাঠ’ হিসেবে।

সংস্কার কাজ শেষ না হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মাঠে খেলাধুলা ও নিয়মিত অনুশীলন কার্যক্রম প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এছাড়া পূর্বে মাঠের যে সৌন্দর্য ছিল, সেটিও নষ্ট হয়েছে বালুর স্তূপের কারণে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বালুর স্তূপকে ‘প্রাচীন পিরামিড’ বলেও হাস্যরস করছেন।

মাঠ প্রসঙ্গে শারীরিক শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. নাজমুল হাসান বলেন,
“আমরা কয়েকদিন আগে কন্ট্রাক্টর, ছাত্র প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ সবাই নিয়ে বসেছি। কাজ দ্রুত করার জন্য আমরা বারবারই বলছি। কাজের বিলম্ব হওয়ার কারণ হলো কন্ট্রাক্টর ঠিকমতো কাজ করে না। আগের কন্ট্রাক্টরের তো বিলও আটকে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি প্রায় ২ মাস আগে নতুন কন্ট্রাক্টরকে কাজ দেওয়া হয়েছে। তারা দ্রুত সময়ে কাজ করবে বলেছে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র কেন্দ্রীয় মাঠের এমন বেহাল দশার বিষয়ে আইন ও বিচার বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও নিয়মিত খেলোয়াড় সানোয়ার রাব্বি প্রমিজ বলেন,
“মাঠ ইস্যুতে আমরা শিক্ষার্থীরা বিরক্ত। প্রতিনিয়ত ইঞ্জিনিয়ারিং দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দপ্তরে যাই, এমনকি ঠিকাদারকেও বলি। আমরা যখন আন্দোলন করি, তখন কাজ হয়, আর যখন আন্দোলন করি না, তখন কাজের গতি মন্থর হয়। গত ৭ মাস ধরে এখনও বালু পড়া শেষ হয়নি। প্রথমে আবহাওয়ার কারণে বিলম্ব হচ্ছে বলেছিল, এখন বলছে ঠিকাদারি ও সরকারি নিয়মের কারণে গতি কমে গেছে। এখন পর্যন্ত এমন কোনো দিন নাই যেদিন ব্যক্তিগতভাবে আমরা ডিপিডি, পিডি, ছাত্রপরামর্শক, প্রক্টরের সাথে দেখা করিনি কিংবা ফোন দিয়ে কাজ করতে বলিনি—এটা উনারা অস্বীকার করতে পারবেন না।”

তিনি আরও বলেন,
“দীর্ঘদিন ধরে এই আন্দোলন করা হচ্ছে মাঠ সংস্কারের জন্য। অভ্যুত্থান পরবর্তীতে বর্তমান প্রশাসন আন্তরিকতা দেখালেও ইঞ্জিনিয়ারিং দপ্তর এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মন্থর গতি আমাদের আশাহত করছে। শারীরিক শিক্ষায় তালা দেওয়া, মানববন্ধন, ভিসির কাছে অনুরোধ—সবই করা হয়েছে। কবে হবে মাঠ? উনারা কি ১০ হাজার শিক্ষার্থীর মন বুঝেন না? অবিলম্বে মাঠের কাজ তরান্বিত করতে হবে, নয়তো কঠোর কর্মসূচিতে যেতে হবে আমাদের।”

জানা গেছে, মাঠ সংস্কারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে ওয়াকওয়ে, সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ ও রাস্তা নির্মাণে ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাঠ সংস্কারের প্রয়োজনে যত টাকা লাগবে তা খরচ করা যাবে।

প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ মোফাসিরুল ইসলাম বলেন,
“আমরা ওদের (কন্ট্রাক্টর) বলেছিলাম সাদা বালু ও লাল বালু নিয়ে আসতে। এরপর মিক্স করা হবে, তারপর একপাশ থেকে বালুগুলো বিছানো হবে। বিছানোর পরে ঘাস লাগানো হবে। তবে আশেপাশে লাল বালুর কোনো সোর্স নেই। লাল বালু আসছে পঞ্চগড় থেকে। লাল বালু ও সাদা বালু মিক্স করতে ২ সপ্তাহের মতো সময় লাগতে পারে। এরপর পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হবে ২ মাস। তবে কোনো সমস্যা না হলে ১ মাসের মধ্যে বালু বিছানো সম্ভব।”

প্রকৌশল দপ্তরের উপ-প্রধান প্রকৌশলী মো. মাহবুবুল ইসলাম বলেন,
“লাল বালু ও সাদা বালু মিক্সিং-এ ১ মাস সময় লাগবে।”

এর আগেও কয়েক ধাপে বালু ফেলা হয়েছে। তবে সেগুলোর ছিল না তেমন কোনো পরিকল্পনা। অপরিকল্পিতভাবে বালু ফেলার কারণেই এবং পূর্বের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের ধীরগতির কারণেই মাঠের এই বেহাল দশা। এছাড়া আগের ঠিকাদারের ড্রেনের কাজেও নিম্নমানের ইট ব্যবহারের ঘটনা ধরা পড়েছে।

আগে অপরিকল্পিতভাবে বালু ফেলার সাথে ইঞ্জিনিয়ারিং দপ্তরের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা জানতে চাইলে মো. মাহবুবুল ইসলাম বলেন,
“প্রথমে যে কাজগুলো হয়েছে, সেগুলো এক্সপার্ট ওপিনিয়ন ছাড়া হয়েছে। বর্তমানে বিকেএসপির এক্সপার্টের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে। এটি আগে থেকে করলে এখন আর কাজ করতে হতো না। এর আগে মাটির টপ লেয়ারে যে ম্যাটেরিয়ালস ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোও এক্সপার্ট ওপিনিয়ন ছাড়া হয়েছে। যার কারণে ঘাস গোঁজানো থেকে শুরু করে নানা কার্যক্রমে সমস্যা হয়েছে।”

জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে প্রায় ১৯০ মিনি ট্রাক বালু ফেলা হয়েছে। এরপরও মাঠের কাজ শেষ হয়নি। মাঠটি দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তবে দুই লেয়ারের মধ্যে প্রথম লেয়ারের কাজ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় লেয়ারের কাজ শুরুর বিষয় উল্লেখ করে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাহাত হাসান দিদার বলেন,
“এখন ডিজাইন অনুযায়ী শেষ লেয়ারের কাজ চলছে। আমরা বিকেএসপিতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে এক্সপার্টের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। তবে প্রথমদিকে কাজের ক্ষেত্রে বিকেএসপির পরামর্শ নেওয়া হয়নি। পরামর্শ নিলে হয়তো টাকা বাঁচত। তবে তখন আমি দায়িত্বে ছিলাম না। আর প্রথমদিকে যে ঠিকাদার কাজ করেছে, সে ছিল ড্রেনের ঠিকাদার। তাকে জরুরি কারণে কাজ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান ঠিকাদারের মতে, বালু ফেলতে ১ মাস সময় লাগবে। মাঠ ব্যবহার উপযোগী হয়ে যাবে। তবে এরপর বিকেএসপির পরামর্শমতে ঘাস লাগাতে হবে।”

তবে মাঠের কাজ শেষ করতে বর্তমান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব এন্টারপ্রাইজের কতদিন সময় লাগবে তা জানতে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মুরাদ মাহবুবকে ফোন দেওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, সংস্কারের নামে এমন বেহাল অবস্থায় নিমজ্জিত কেন্দ্রীয় খেলার মাঠটি একসময় সবুজ ঘাসে পরিপূর্ণ সুন্দর একটি মাঠ ছিল বলে দাবি সাধারণ শিক্ষার্থীদের। পূর্বের মতো খেলার জন্য উপযোগী ও সবুজ ঘাসে পরিপূর্ণ মাঠ দেখার অপেক্ষায় আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *