শিক্ষিত ও দক্ষ প্রার্থী নিয়ে ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি

স্বাধীন সংবাদ ডেস্ক:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি যে প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কারণ দলটি এবার মনোনয়নের ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখিয়েছে, বিশেষ করে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে।

দলটির সম্ভাব্য একক প্রার্থীদের অন্তত ৮৫ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত, যার মধ্যে রয়েছেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক এবং বিদেশ থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করা ব্যক্তিরা। এই উচ্চশিক্ষিতদের উপস্থিতি শুধু বিএনপির মনোনয়ন প্রক্রিয়াকে আলাদা করে তোলে না, বরং পুরো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই নতুন একটি মাত্রা যোগ করেছে। প্রার্থী তালিকায় থাকা অনেকেই পড়াশোনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ার নামকরা বিদ্যাপীঠে। এমনকি আইভি লিগভুক্ত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন কমপক্ষে দুইজন প্রার্থী।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন তালিকার প্রায় ১৪ শতাংশ ব্যক্তি। এছাড়া অন্তত ৪০ শতাংশ প্রার্থী পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা তার অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে। বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, ঘোষিত ২৩৭ আসনের মধ্যে একটি স্থগিত থাকলেও ২৩৬ আসনের প্রার্থীদের মধ্যে ২২৩ জনের শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই করা হয়েছে, যা থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া গেছে।

যাচাইকৃত এই তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২২৩ জনের মধ্যে ৮৭ জন স্নাতক ডিগ্রিধারী। এদের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ আইন বিষয়ে স্নাতক, ১৬ শতাংশ বিজ্ঞান বিষয়ে এবং ১৮ শতাংশ ব্যবসায় শিক্ষায় ডিগ্রি অর্জন করেছেন। শুধু স্নাতক ডিগ্রি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন এমনদের মধ্যেও অন্তত আটজন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। বিদেশে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে রয়েছেন সুপরিচিত আইনজীবী ও বিএনপি নেতা মাহবুব উদ্দিন খোকন, যিনি যুক্তরাজ্যের ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি করেছেন।

তিনি জুলাই আন্দোলনের সময় মার্চ ফর জাস্টিস সংগঠনে ভূমিকা রাখার কারণে বিশেষভাবে আলোচিত ছিলেন। বিদায়ী সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামালও পড়াশোনা করেছেন যুক্তরাজ্যের উলভারহ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি করেছেন ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী, যিনি এবার কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে লড়বেন। নাটোর-১ আসনের প্রার্থী ফারজানা শারমিন পুতুলও যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। আইন বিষয়ে বিদেশফেরত প্রার্থীদের অন্তর্ভুক্তি বিএনপির আইন ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো মনে করছে।

বিএনপির প্রার্থী তালিকায় যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পিএইচডিধারীও রয়েছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের ইমপেরিয়াল কলেজে পড়াশোনা করছিলেন এবং সেখান থেকেই প্রবাসীদের স্বাধীনতার পক্ষে সংগঠিত করার কাজে যুক্ত ছিলেন।

পরে একই প্রতিষ্ঠান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফিরে আসেন। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেতা এবার লড়বেন কুমিল্লা-১ আসন থেকে। আরেকজন পিএইচডিধারী ড. আব্দুল মঈন খান, যিনি সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। তিনি ২০০২ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশকে সাবমেরিন কেবলের নেটওয়ার্কে যুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং ওই সময়ে তার দায়িত্ব পালন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

প্রার্থী তালিকায় ২০ জনের মতো ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার রয়েছেন। ডাক্তারদের মধ্যে আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, যিনি এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স থেকে এফআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করেন। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. এমএ মুহিত লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন থেকে উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন।

তিনি এবার সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে লড়বেন। একইভাবে ২০১৮ নির্বাচনে সর্বকনিষ্ঠ প্রার্থী হিসেবে আলোচিত ডা. সানসিলা জেবরিন এবারের নির্বাচনেও শেরপুর-১ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন। ডাক্তারি পেশায় যুক্ত থাকা আরও কয়েকজন হচ্ছেন খন্দকার জিয়াউল ইসলাম মোহাম্মদ আলী, অধ্যাপক সৈয়দ মাইনুল হাসান সাদিক, একরামুল বারী টিপু, মাহবুবুর রহমান লিটন, আনোয়ারুল হক, দেওয়ান মো. সালাহউদ্দিন, অধ্যাপক এসএম রফিকুল ইসলাম এবং আবু মনসুর সাখাওয়াত হোসেন জীবন। তাদের অনেকেই স্থানীয় পর্যায়ে পরিষেবা উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার কারণে পরিচিত।

ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে রয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ–অ্যাবের উপদেষ্টা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, বুয়েট থেকে পাশ করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার এবং বুয়েট গ্র্যাজুয়েটস ক্লাবের সভাপতি খালেদ হোসেন মাহবুব। এছাড়া রুয়েট থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুলও রয়েছেন এই তালিকায়।

দেশের বাইরে প্রকৌশল বিদ্যায় ডিগ্রি নিয়েছেন বিএনপি নেতা শামা ওবায়েদ, ইশরাক হোসেন, মাইনুল ইসলাম খান এবং ফাহিম চৌধুরী। বিএনপি মনে করছে, ইঞ্জিনিয়ারদের এই উপস্থিতি ভবিষ্যতে অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নগরায়ণ ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন পরিকল্পনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রার্থী তালিকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো আইভি লিগ অ্যালামনাইদের অন্তর্ভুক্তি, যা বাংলাদেশি রাজনীতিতে খুবই বিরল ঘটনা। বিএনপির দুই প্রার্থী ড. ওসমান ফারুক এবং ব্যারিস্টার নওশাদ জমির আইভি লিগভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন। ড. ওসমান ফারুক কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন।

তিনি বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে কাজ করার অভিজ্ঞতা রাখেন এবং পরে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্যাক্সেশন বিষয়ে এমএসসি এবং হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে এলএলএম সম্পন্ন করেছেন। তিনি এবার পঞ্চগড়-১ আসনে লড়বেন। তাদের অন্তর্ভুক্তিকে বিএনপির আন্তর্জাতিকভাবে প্রশিক্ষিত নেতৃত্ব গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নবীন ও তরুণ নেতৃত্বও এবারের তালিকায় উল্লেখযোগ্যভাবে জায়গা পেয়েছে। ছাত্রদলের সাবেক অনেক নেতা এই তালিকায় রয়েছেন, যাদের মধ্যে আছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমান উল্লাহ আমান, খায়রুল কবির খোকন, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, রকিবুল ইসলাম বকুল, আজিজুল বারী হেলাল, আমিরুল ইসলাম খান আলিম, নুরুল ইসলাম নয়ন, শহীদুল ইসলাম বাবুল, রাজিব আহসান ও কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ। বিএনপি মনে করে, আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা তরুণ ও মধ্যবয়সী নেতৃত্বকে সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে তারা দলীয় সংগঠনকে আরও গতিশীল করতে পারবে।

দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও সালাহউদ্দিন আহমদও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন। এই উচ্চশিক্ষিত নেতৃত্ব বিএনপির নীতি নির্ধারণ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দলকে উপস্থাপনে ভূমিকা রাখবে বলে দলীয় সূত্রগুলো মনে করে।

অন্যদিকে শেখ হাসিনা সরকারের সময় গুম হওয়া সাবেক ছাত্রদল নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীও এবার মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই প্রার্থী বাছাই একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। তারা মনে করেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, গণতান্ত্রিক কাঠামোর দুর্বলতা, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে জনগণ এখন নতুন ধরনের নেতৃত্ব দেখতে চায়।

উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ, পেশাদার ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতৃত্ব সেই জনগণের আকাঙ্ক্ষাই প্রতিফলিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদের রাজনীতিতে আসা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে শিক্ষা একমাত্র মাপকাঠি নয়—জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকতে হয়। তিনি বলেন, যদি কেউ এলাকায় না যান বা জনগণের সেবা না করেন, তবে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে মানুষের উপকার হবে না। কারণ রাজনীতির উদ্দেশ্যই হচ্ছে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করা।

বিএনপির অভ্যন্তরে এই তালিকা নিয়ে যেমন সন্তুষ্টি রয়েছে, তেমনি কিছু জায়গায় সমালোচনাও আছে। কয়েকজন দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা বাদ পড়ায় কিছু অঞ্চলে অসন্তোষ দেখা গেছে। তবে দলীয় নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব নিতে সক্ষম এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতায় যারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তারা মনে করেন, পড়াশোনা, দক্ষতা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সততার সংমিশ্রণে গঠিত নেতৃত্বই আগামী দিনে দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করতে পারবে।

সর্বোপরি, বিএনপির শিক্ষিত প্রার্থী তালিকা এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কেউ এটিকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন, কেউ দেখছেন ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা।

নির্বাচনের আগে এই তালিকা আরও পরিবর্তন বা পরিমার্জন হতে পারে, তবে স্পষ্ট যে বিএনপি এবার শিক্ষাগত যোগ্যতা, পরিচ্ছন্ন ইমেজ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা—এই তিনটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত ভোটারদের কাছে কী ধরনের বার্তা পৌঁছায় এবং নির্বাচনী মাঠে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে—তা সময়ই বলে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *