মোটরযান পরিদর্শক ওমর ফারুকের বদলীতে সমালোচনার ঝড়

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআরটিএ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্থাটির বর্তমান চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দীন আহম্মেদ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। তার নেতৃত্বে পরিদর্শন ছাড়া গাড়ির ফিটনেস সনদ প্রদান বন্ধ করা, ঘুষ–দালালবৃত্তি রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণসহ চালকদের দক্ষতা বাড়াতে ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলমান। একইসঙ্গে সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে আন্তর্জাতিক মানের ড্রাইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে।

তবে সংস্থার ভেতরে গচ্ছিত কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে এসব উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তথ্য বিভ্রাট, অনিয়মের মামলা এবং পুরোনো অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা আবারও গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে পদায়ন পাচ্ছেন, যা নীতিনির্ধারক মহলে প্রশ্ন তুলেছে। সেই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নাম মোটরযান পরিদর্শক মো. ওমর ফারুক। বর্তমানে তিনি বিআরটিএর সাতক্ষীরা সার্কেলে কর্মরত, যেখানে ১২ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে তিনি যোগদান করেছেন।

বাগেরহাট সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ওঠে ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর এবং ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ইফাদ অটোস লিমিটেডের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করে অনুমোদনবিহীন স্লিপার বাসের রেজিস্ট্রেশন প্রদান করেন। স্লিপার বাসগুলোর আসন বিন্যাস ছিল অনুমোদিত নকশার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ঝুলন্ত সিট ছিল বিপজ্জনকভাবে স্থাপন করা। পরিদর্শন ছাড়াই এসব যানবাহন সড়কে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার ফলে সাধারণ যাত্রী ঝুঁকির মুখে পড়ে।

বাসগুলো একাধিকবার ভয়াবহ দুর্ঘটনায় জড়িয়েছে, যার নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। সবচেয়ে আলোচিত দুর্ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ১৭ মে—যেখানে যশোর-ব-১১-০২৫১ নাম্বারের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাঁচজনের প্রাণ কেড়ে নেয়। কুমিল্লা সার্কেলের তৎকালীন পরিদর্শন প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে বাসটির আসন বিন্যাস অনুমোদনযোগ্য নয় এবং এটি পরিদর্শন রিপোর্ট ছাড়া নিবন্ধন পেয়েছে ঘুষের বিনিময়ে। সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ কর্মকর্তা হিসেবে এই অবৈধ রেজিস্ট্রেশন অনুমোদন করেন oমর ফারুক, এমন তথ্য উঠে আসে দুর্ঘটনা তদন্ত প্রতিবেদনে।

কুমিল্লার মিয়াবাজার হাইওয়ে থানার উপ–পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) চন্দন কান্তি দাশ সাম্প্রতিক আরেকটি দুর্ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে একই বাসের (যশোর–ব–১১–০২৫১) মালিকানা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে বিআরটিএ ও ইফাদ অটোস লিমিটেডকে চিঠি দেন। তিনি জানান, এই বাসটি ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট ৬০ বছর বয়সি এক নারীকে চাপা দিয়ে হত্যা করে। সড়ক পরিবহন আইনের ১০৫ ধারা অনুযায়ী একটি মামলা রুজু করা হয়েছে—মামলা নং ০৬/৩১৫, তারিখ ০৬–০৮–২০২৫

এদিকে, বিআরটিএর কুমিল্লা সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক সাইফুল ইসলামও নিশ্চিত করেছেন যে তারা পুলিশ থেকে বাসটির মালিকানা সংক্রান্ত চিঠি পেয়েছেন। এর আগেও ২০২৪ সালের দুর্ঘটনার পর তিনি ঘটনাস্থলে পরিদর্শনে যান এবং দেখতে পান বাসটির আসন বিন্যাস অনুমোদিত নির্দেশিকার বাইরে ছিল। অর্থাৎ, পরিদর্শন ছাড়া রেজিস্ট্রেশন প্রদানের প্রমাণ বারবার মিলেছে বিভিন্ন ঘটনায়।

বিআরটিএর অভ্যন্তরের একটি সূত্র জানায়, ওমর ফারুক শুধু এককভাবে নয়—যশোর সার্কেলে অবস্থানকালে বড় একটি দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি—এই সময়ে যশোর সিরিজের অন্তত ১২টি স্লিপার কোচ (যশোর-ব-১১-০২৫০ থেকে ০২৬১ পর্যন্ত) নিবন্ধনে তিনি পরিদর্শন রিপোর্ট দিয়েছিলেন। এসব রেজিস্ট্রেশনই এখন তদন্ত কর্তৃপক্ষের নজরে।

সূত্র মতে, তিনি কুষ্টিয়া সার্কেল থেকে ২০২১ সালে যশোরে বদলি হন। সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর বিআরটিএর কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় তাকে সুনামগঞ্জে বদলি করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে—তিনি সাবেক চেয়ারম্যানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সেই আদেশ বাতিল করিয়ে নেন।

পরবর্তীতে, ২০২৪ সালের ১২ জানুয়ারি সাবেক চেয়ারম্যান মো. ইয়াসীন বাধ্য হন তাকে তার পছন্দের সার্কেল বাগেরহাটে পোস্টিং দিতে। এটি ছিল পূর্বের বদলি আদেশ বাতিলের সরাসরি ফলাফল। বিআরটিএর কর্মকর্তারা তখন থেকেই মন্তব্য করতে শুরু করেন—“এই পরিদর্শকের প্রভাব এমন যে নীতিমালা অনুসরণ করতেই বাধাগ্রস্ত হন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তারা।”

বাগেরহাট সার্কেলে ২৬৮ দিন দায়িত্ব পালনের পর তাকে আবারও পছন্দের সার্কেল সাতক্ষীরাতে বদলি করা হয়। ৮ অক্টোবর জারি হওয়া উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. হেমায়েত উদ্দিন স্বাক্ষরিত চিঠি দেখে বিআরটিএর অন্যান্য কর্মকর্তারা বিস্মিত হন। এমনকি বাংলাদেশ পুলিশের কিছু কর্মকর্তা—যারা দুর্ঘটনাজনিত মামলাগুলো তদন্ত করছেন—তারাই বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ থাকা অবস্থায় এত দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে বদলি হওয়া বিস্ময়কর।”

১২ অক্টোবর ২০২৫—ওমর ফারুক সাতক্ষীরা সার্কেলে তার নতুন দায়িত্বে যোগ দেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই বদলি কি নীতিমালা মেনে হয়েছে, নাকি পুরোনো প্রভাব–বলয়ের জোরেই?

বিআরটিএ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সারাদেশে ঘুষ–অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন সার্কেল থেকে বহু কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু ওমর ফারুকের মতো অভিযোগযুক্ত কর্মকর্তাকে বারবার গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে পদায়ন প্রতিষ্ঠানটির শুদ্ধাচার উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

এ বিষয়ে জানতে মোটরযান পরিদর্শক মো. ওমর ফারুকের ব্যক্তিগত ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

স্লিপার বাসের অনিয়মিত রেজিস্ট্রেশন, পরিদর্শন রিপোর্ট ছাড়াই সড়কে নামা, ঝুলন্ত সিট, নন-কমপ্লায়েন্ট আসন বিন্যাস—এসব কারণে দেশজুড়ে ঘন ঘন দুর্ঘটনা ঘটছে। বিআরটিএর আধুনিকায়ন ও সেবার মান উন্নয়নে চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দীন আহম্মেদের যে কঠোর পদক্ষেপ, তা সফল হবে কিনা—তা নির্ভর করছে এই ধরনের দুর্নীতিবাজ উপাদানগুলোকে দমন করার ওপর।

সরকারের সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর জাতীয় লক্ষ্য পূরণে যে সব কর্মকর্তা স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের প্রতিবন্ধক—তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের জীবনঝুঁকি থেকে যাবে অক্ষুণ্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *