রূপসা উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়: দুদকের মামলার পরও বহাল তবিয়তে আশরাফুজ্জামান

মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:

খুলনা জেলার রূপসা উপজেলায় খাদ্য বিভাগে দুর্নীতির এক নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের ঝড় উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা এবং গুরুতর সব অভিযোগের পরও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি, যা নিয়ে স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

পুরনো পাপী, নতুন কর্মস্থল

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মো. আশরাফুজ্জামান ২০১০ সালে খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত যশোর খাদ্য গুদামে থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রথম অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে খুলনার তেরখাদায় কর্মরত অবস্থায় ২০২২ সালের জুলাই মাসে দুদকের যশোর সমন্বিত কার্যালয় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে (মামলা নং-০৪/২০২২)।

দুদকের মামলার এজাহার অনুযায়ী, আশরাফুজ্জামান ও তার স্ত্রী রোকেয়া সুলতানা ১ কোটি ১৬ লাখ টাকার সম্পদ গোপন করেছেন এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ১ কোটি ৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মামলার পরও তাকে শাস্তির বদলে রূপসা উপজেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বদলি করা হয়েছে।

রূপসায় দুর্নীতির ‘মহা-উৎসব’

রূপসা উপজেলায় যোগদানের পর থেকে আশরাফুজ্জামান যেন দুর্নীতির জাল আরও বিস্তৃত করেছেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রধান অভিযোগগুলো হলো:

  • সংগ্রহ অভিযানে প্রকাশ্য ঘুষ: আমন ধান-চাল সংগ্রহে কেজিপ্রতি নির্দিষ্ট হারে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের অভিযোগ, ঘুষ না দিলে নিম্নমানের অজুহাতে তাদের ধান ফেরত দেওয়া হয়। আবার প্রভাবশালী মিলারদের কাছ থেকে নিম্নমানের চাল নিয়ে উচ্চমানের হিসেবে বিল পাস করা হচ্ছে।

  • গুদাম ও বস্তা কেলেঙ্কারি: খাদ্য গুদামে পুরাতন ও পচা বস্তা ব্যবহার করে এবং ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে নতুন বস্তা ক্রয়ের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। গুদামে রক্ষিত চালের ওজনে কারচুপি এবং সরকারি মজুদ সরিয়ে ফেলার মতো গুরুতর বিষয়ও উঠে এসেছে।

  • সিন্ডিকেট ও বদলি বাণিজ্য: আরসি ফুডসহ প্রভাবশালী মিল মালিকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং ওএমএস (OMS) ডিলারশিপে মোটা অংকের টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী ‘বদলি সিন্ডিকেট’ কাজ করছে বলে জানা গেছে।

স্ত্রীর নামে সম্পদের পাহাড়: দুদকের নতুন তদন্ত

সূত্রমতে, রূপসায় দায়িত্ব পালনকালে আশরাফুজ্জামান অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকা দিয়ে তার স্ত্রীর নামে বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি ক্রয় করেছেন। তার বিরুদ্ধে দুদকের যশোর কার্যালয়ে নতুন করে আরও একটি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের আর্তনাদ ও প্রশাসনিক নিশ্চুপতা

রূপসার স্থানীয় কৃষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি ভর্তুকির সুবিধা আমাদের কাছে পৌঁছায় না। কর্মকর্তাদের পকেট ভারী করতেই আমাদের ঘাম ঝরানো ধান পানির দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।” ভুক্তভোগী ডিলাররা জানান, আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক বা ডিসি ফুড অফিসের ইশারা ছাড়া আশরাফুজ্জামানের পক্ষে এককভাবে এই বিশাল দুর্নীতি করা সম্ভব নয়।

প্রত্যাশা ও দাবি

খাদ্য বিভাগের এই ‘ঘুষ-দুর্নীতির আখড়া’ বন্ধে শুধু বদলি কোনো সমাধান নয়। সচেতন মহলের দাবি, দুদকের তদন্ত দ্রুত শেষ করে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং কঠোর আইনানুগ শাস্তি প্রদান করতে হবে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভাগীয় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *