মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:
খুলনায় পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরই যেন এখন পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে অভিযুক্ত। খুলনা অঞ্চলে Department of Environment (DoE)-এর ব্যবস্থাপক ও সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতি, উৎকোচ গ্রহণ এবং পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলো এতটাই বিস্তৃত যে বিষয়টি ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর অনুসন্ধানে গড়িয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ইঙ্গিত মিলেছে—পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন অনুমোদন এবং শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক চক্র সক্রিয় রয়েছে। ফলে একদিকে যেমন সরকারি কোষাগার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে খুলনা বিভাগের নদী-খাল, বায়ু ও মাটির দূষণ বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
দৈনিক স্বাধীন সংবাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র বা Environmental Clearance Certificate (ECC) প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াটিই দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়েছে। শিল্প-কারখানা, ইটভাটা ও রিয়েল এস্টেট প্রকল্প পরিচালনার জন্য আইন অনুযায়ী ECC বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ঘুষ ছাড়া এই ছাড়পত্র পাওয়া প্রায় অসম্ভব। স্থানীয় শিল্প মালিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা লাখ লাখ টাকা উৎকোচের বিনিময়ে অবৈধ বা শর্তভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছেন। দুদকের অনুসন্ধানেও এমন অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ট্যানারি, সিমেন্ট কারখানা, ইটভাটা কিংবা বৃহৎ নির্মাণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ECC পেতে ৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়। Transparency International Bangladesh (TIB)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশব্যাপী প্রায় ৫৬ শতাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। খুলনার রূপসা, ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলায় অসংখ্য ইটভাটা ECC ছাড়াই বা ঘুষের বিনিময়ে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটছে।
শুধু ছাড়পত্র প্রদানেই নয়, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) প্রতিবেদন অনুমোদনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বড় শিল্প প্রকল্প চালুর আগে পরিবেশগত ঝুঁকি যাচাই করে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, নিম্নমানের কিংবা ভুয়া প্রতিবেদনও ঘুষের বিনিময়ে অনুমোদন পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। ফলে শিল্প বর্জ্য সরাসরি ভৈরব নদী, রূপসা নদী ও ময়ূরাক্ষী নদী-তে ফেলা হচ্ছে। কোথাও পর্যাপ্ত বর্জ্য শোধনাগার নেই, কোথাও থাকলেও তা অচল। অথচ নিয়মিত তদারকি বা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো নজির নেই।
পরিবেশগত শর্তাবলী লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ECC দেওয়ার সময় নির্ধারিত শর্ত—যেমন বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন, নির্ধারিত মান বজায় রেখে ধোঁয়া নির্গমন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ—এসব মানা না হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযান বা জরিমানা হয় না। দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উৎকোচের বিনিময়ে এসব লঙ্ঘনকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ফলে দূষণ বাড়লেও প্রশাসনিক নীরবতা বজায় থাকছে।
খুলনা বিভাগে পরিবেশ দূষণের চিত্র দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। শিল্পায়নের বিস্তার এবং নিয়ন্ত্রণহীন ইটভাটা কার্যক্রমের কারণে বায়ু ও পানিদূষণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা IQAir-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বায়ুদূষণে বিশ্বের শীর্ষ দূষিত দেশগুলোর একটি। খুলনা শহরে প্রায়ই PM2.5 মাত্রা ১৫০ থেকে ৩০০-এর উপরে অবস্থান করে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ দূষণের কারণে দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) প্রায় ২.৭ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে এবং শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো রোগের প্রকোপ বাড়ছে।
২০২৫ সালে খুলনায় অনুষ্ঠিত এক গণশুনানিতে ১৭২টি অভিযোগের মধ্যে ৫৯টি আমলে নেওয়া হয়, যার একটি বড় অংশ ছিল পরিবেশ অধিদপ্তরের অনিয়ম সংক্রান্ত। দুদক সূত্রে জানা গেছে, ECC-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো এখনো অনুসন্ধানাধীন। একই সঙ্গে দেশব্যাপী পরিবেশ অধিদপ্তরে দুর্নীতির অন্তত ১২টি প্রধান উৎস চিহ্নিত হয়েছে, যার মধ্যে ECC প্রক্রিয়া অন্যতম। দুদকের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে অনলাইন ভিত্তিক ECC আবেদন ও অনুমোদন ব্যবস্থা চালু, নিয়মিত অডিট এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
খুলনার পরিবেশবাদী সংগঠন, কৃষক, মৎস্যজীবী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি—দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। ECC প্রক্রিয়াকে শতভাগ অনলাইন ও স্বচ্ছ করতে হবে, নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে এবং শর্তভঙ্গকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হবে। TIB ইতোমধ্যে পরিবেশ খাতে দুর্নীতি রোধে ১০ দফা সুপারিশ দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আইনের কঠোর প্রয়োগ, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠন।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিবেশ অধিদপ্তরের ভেতরে দুর্নীতি কেবল অর্থ লুটের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশকে বিপন্ন করে তোলার সামিল। খুলনার নদী, কৃষিজমি ও বায়ু যদি এভাবে দূষিত হতে থাকে, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হবে মারাত্মক। তাই শুধু তদন্ত নয়, দৃশ্যমান ও কার্যকর ফলাফল এখন সময়ের দাবি। সরকার, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধ করা কঠিন।
দৈনিক স্বাধীন সংবাদ এ বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখবে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নিয়ে পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।