খুলনা মানিকতলা এলাকায় গরিবের ৮ বস্তা আটা গায়েব, ফুড পরিদর্শক ও ডিলারের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি

মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:

খুলনা মহানগরীর মানিকতলা এলাকায় সরকারি খাদ্য সহায়তার আওতায় বিতরণের জন্য বরাদ্দকৃত আট বস্তা আটা গায়েব হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের একাংশ ফুড পরিদর্শক অমিত ও সংশ্লিষ্ট ডিলারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও যোগসাজশের অভিযোগ তুলেছেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে এবং দরিদ্র উপকারভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চলতি মাসে টিসিবি ও ওএমএস কর্মসূচির আওতায় মানিকতলা এলাকায় নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর মাঝে আটা বিতরণের কথা ছিল। নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী প্রত্যেক উপকারভোগীর নির্দিষ্ট পরিমাণ আটা পৌঁছানোর কথা থাকলেও বাস্তবে ঘাটতির অভিযোগ ওঠে। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, “আমাদের কার্ডে পাঁচ কেজি করে আটা পাওয়ার কথা। কিন্তু ডিলার বলছে মাল কম এসেছে। পরে জানতে পারি আট বস্তা আটা হিসাবেই নেই।”

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট গুদাম থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আটা ডিলারের দোকানে পৌঁছানোর রেজিস্টারভুক্ত তথ্য রয়েছে। তবে বিতরণ শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখা যায়, আট বস্তা আটার কোনো সঠিক হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে, এই ঘাটতির বিষয়ে ফুড পরিদর্শকের তদারকি ছিল শিথিল, বরং তিনি ডিলারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

অভিযোগকারী এক ব্যক্তি বলেন, “আমরা লিখিত অভিযোগ দিতে গেলে আমাদের নিরুৎসাহিত করা হয়। বলা হয়—ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কিন্তু গুদামের চালান কাগজ আর বিতরণ রেজিস্টার মিলছে না। এভাবে সাধারণ মানুষ যেন ঠকছে।”

উপকারভোগীদের ক্ষোভও যথেষ্ট তীব্র। মানিকতলার বেশ কয়েকজন নারী উপকারভোগী জানান, তারা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও আটা না পেয়ে ফিরে গেছেন। অনেকের দাবি, “আগে আসলে আগে পাবেন” নীতির কথা বলে তালিকাভুক্তদের বাদ দিয়ে অন্যদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এক প্রবীণ উপকারভোগী বলেন, “সরকার গরিবের জন্য দেয়, আর মাঝখানে যারা থাকে তারা কেটে নেয়। আমরা চাই ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ফুড পরিদর্শক অমিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আটা গায়েবের কোনো ঘটনা ঘটেনি। সামান্য হিসাব বিভ্রাট ছিল, যা ঠিক করা হচ্ছে। কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। সরকারী বরাদ্দ অনুযায়ীই বিতরণ হয়েছে। তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।”

অভিযুক্ত ডিলারও এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, গুদাম থেকে কম মাল এসেছে। তার ভাষ্য, “আমি যতটুকু পেয়েছি ততটুকুই বিতরণ করেছি। ঘাটতির দায় আমার নয়।” তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, গুদাম থেকে কম মাল এলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে কেন জানানো হয়নি? কেন বিতরণের আগে তালিকা সমন্বয় করা হয়নি? এসব প্রশ্নের জবাব এখনো পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা আসেনি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। স্থানীয়দের দাবি, এর আগেও বিভিন্ন সময় খাদ্য সহায়তা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কখনও কম ওজন দেওয়া, কখনও তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত হওয়া—এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। তবে এবার সরাসরি ‘আট বস্তা আটা গায়েব’-এর অভিযোগ পরিস্থিতিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

খুলনার সামাজিক সংগঠকরা বলছেন, দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ খাদ্যসামগ্রী আত্মসাৎ প্রমাণিত হলে তা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। তারা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। এক মানবাধিকার কর্মী বলেন, “খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে অনিয়ম মানে সরাসরি গরিব মানুষের মুখের আহার কেড়ে নেওয়া। এখানে কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। গুদাম থেকে ডিলার পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলে ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করা, উপকারভোগীদের এসএমএস নোটিফিকেশন, প্রকাশ্য স্থানে স্টক ও বিতরণ তালিকা টানানো, নিয়মিত অডিট এবং হঠাৎ পরিদর্শন—এসব ব্যবস্থা নিলে অনিয়মের সুযোগ কমানো সম্ভব।

উপসংহার হিসেবে বলা যায়, মানিকতলা এলাকার আট বস্তা আটা গায়েবের অভিযোগ এখন তদন্তের অপেক্ষায়। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে বলে সচেতন মহল আশঙ্কা করছেন। গরিবদের অধিকার রক্ষায় দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *