রায় আছে, গেজেট আছে—তবু শপথ নেই: মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদে কেন এই বিলম্ব?

স্টাফ রিপোর্টার:


মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের রায়ে বিজয়ী ঘোষিত এবং নির্বাচন কমিশনের সংশোধনী গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরও কে এম বজলুল হক খানকে এখনো শপথ পড়ানো হয়নি। নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও কেন বিলম্ব?

নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে পূর্বে বিজয়ী ঘোষিত গোলাম মহীউদ্দিনের নাম বাতিল করে ‘চশমা’ প্রতীকের প্রার্থী কে এম বজলুল হক খানকে বৈধভাবে নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে গেজেটভুক্ত করেছে। কিন্তু গেজেট প্রকাশের মাস পেরিয়ে গেলেও শপথ না হওয়ায় বিষয়টি এখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন প্রশাসন শাখা থেকে প্রকাশিত ২৮ আগস্ট ২০২৫ তারিখের সংশোধনী বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্বাচনি মামলা নং ০১/২০২২-নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল, মানিকগঞ্জের ১৩ জুলাই ২০২৫ তারিখের আদেশ অনুযায়ী চেয়ারম্যান পদে পূর্বে নির্বাচিত ঘোষিত গোলাম মহীউদ্দিনের নির্বাচন বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে ওই আদেশের আলোকে কে এম বজলুল হক খানকে নির্বাচিত ঘোষণা করে কমিশন ২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত গেজেট সংশোধন করে।

সংশোধনী গেজেটে আগের গেজেটে থাকা গোলাম মহীউদ্দিনের নাম, পরিচয় ঠিকানার পরিবর্তে কে এম বজলুল হক খান, পিতা: নূরুল হক খান, গ্রাম: পশ্চিম বান্দুটিয়া, উপজেলা: মানিকগঞ্জ সদর, জেলা: মানিকগঞ্জ—এই তথ্য প্রতিস্থাপন করা হয়। ২৭ অক্টোবর ২০২২ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যার ১৭১৯১ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত ১নং কলামের বিপরীতে ২নং কলামে বর্ণিত ‘গোলাম মহীউদ্দীন, পিতা: গোলজার হোসেন, গ্রাম: আন্ধারমানিক, ডাকঘর: হরিরামপুর, উপজেলা: হরিরামপুর, জেলা: মানিকগঞ্জ’ এর পরিবর্তে ‘কে এম বজলুল হক খান, পিতা: নূরুল হক খান, গ্রাম: পশ্চিম বান্দুটিয়া, উপজেলা: মানিকগঞ্জ সদর, জেলা: মানিকগঞ্জ’ শব্দ চিহ্নসমূহ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে উঠে আসে নির্বাচনে অনিয়মের চিত্র। মামলার আদেশে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছেন, নির্বাচন চলাকালে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, উপঢৌকন বিতরণ, ভোটগ্রহণে অনিয়ম, সিসি ক্যামেরা বন্ধ থাকা, বিদ্যুৎ ইন্টারনেট সংযোগে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং বেআইনি প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রতীয়মান হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব বেআইনি আচরণ দুর্নীতিমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে নির্বাচনি ফলাফল প্রভাবিত হয়েছে।

রায়ে আরও বলা হয়, ফলাফল নিয়ে সরাসরি কারচুপির অভিযোগ পুনঃগণনায় প্রমাণিত না হলেও নির্বাচনি পরিবেশকে প্রভাবিত করা, ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রচারণা বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগগুলো বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যে সমর্থিত। ফলে জেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা, ২০১৬ অনুসারে গোলাম মহীউদ্দিনের নির্বাচন বাতিলযোগ্য এবং একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে কে এম বজলুল হক খানই যথাযথভাবে নির্বাচিত।

গেজেট আছে, শপথ নেই। সংশোধনী গেজেট প্রকাশের পর সাধারণভাবে শপথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও এখনো বজলুল হক খানকে চেয়ারম্যান হিসেবে শপথ পড়ানো হয়নি। এতে মানিকগঞ্জে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদালতের রায় এবং সরকারি গেজেট—দুই-কার্যকর হওয়ার পরও শপথে বিলম্ব অস্বাভাবিক।

এই পরিস্থিতিতে কে এম বজলুল হক খান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে আবেদন করে গেজেট অনুযায়ী তাকে শপথ পড়িয়ে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তার আবেদনে বলা হয়, ট্রাইব্যুনালের রায় গেজেট প্রকাশের পরও দায়িত্ব গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করা মানিকগঞ্জবাসীর প্রত্যাশার পরিপন্থী।

শপথ না হওয়ায় হাইকোর্টে রিট করা হয়। দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ তুলে বিষয়টি পরে হাইকোর্ট বিভাগে রিট আকারে উপস্থাপিত হয়। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী বিচারপতি মো. জিয়াউল হক সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রুল জারি করেন।

আদালত সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের কাছে জানতে চান, ২৮ আগস্ট ২০২৫-এর গেজেট অনুযায়ী আবেদনকারীকে মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে শপথ না পড়ানো কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে আদালত চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়ে তিন মাসের জন্য স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। এছাড়া আবেদনকারীর ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

মানিকগঞ্জে এই বিলম্ব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায়, নির্বাচন কমিশনের সংশোধনী গেজেট এবং হাইকোর্টের রুলের পরও শপথ না হওয়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন, আইনজীবী মহল স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, আইনগতভাবে বিজয়ী ঘোষিত একজন জনপ্রতিনিধিকে শপথ পড়াতে বিলম্ব করা হলে তা শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়, গণরায়ের প্রতিফলনেও বাধা সৃষ্টি করে।

তাদের মতে, আদালতের রায়, নির্বাচন কমিশনের গেজেট এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতি সম্মান দেখিয়ে দ্রুত শপথ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা উচিত। এতে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটবে এবং মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রমও স্বাভাবিক হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *