কামরাঙ্গীরচরে চাঁদা না পেয়ে সন্ত্রাসী হামলা: ব্যবসায়ীর অফিসে তাণ্ডব, ৩ কর্মী রক্তাক্ত

স্টাফ রিপোর্টারঃ
রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে দিনদুপুরের আঁধারে ঘটে গেল এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী তাণ্ডব। পঞ্চাশ লক্ষ টাকা চাঁদা না পেয়ে একজন ব্যবসায়ীর অফিসে হামলা চালিয়ে তিন নিরীহ কর্মীকে রক্তাক্ত করেছে স্থানীয় এক চাঁদাবাজ চক্র। শুধু তাই নয়, “হত্যা করে লাশ গুম করে দেওয়ার” প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে দুর্বৃত্তরা। ঘটনায় কামরাঙ্গীরচর থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মোঃ কামরুজ্জামান।
যেভাবে শুরু হয়েছিল বিরোধ
পুরাতন বিদ্যুৎ অফিস গলির বাসিন্দা ও পেশাদার ব্যবসায়ী মোঃ কামরুজ্জামান (৪৬)-এর সঙ্গে প্রায় এক বছর আগে পরিচয় হয় একই থানা এলাকার মোঃ আবু সাইদু হোসেন দুলালের (৪৫)। পরিচয় ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। সেই সুযোগে দুলাল বিভিন্ন সময়ে কামরুজ্জামানের কাছ থেকে ধার নিতে থাকেন। দিনের পর দিন ধার নিয়ে মোট ১ লক্ষ ৯৩ হাজার ৭০৫ টাকা আত্মসাৎ করেন তিনি।
একসময় কামরুজ্জামান তাঁর কষ্টার্জিত টাকা ফেরত চাইলে দুলালের মুখোশ খুলে যায়। টাকা ফেরত দেওয়ার বদলে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক, এরপর সরাসরি হুমকি। সহজ-সরল ব্যবসায়ীকে চাপে রাখতে ধার শোধের বদলে উল্টো চাঁদাবাজির ফাঁদ পাতেন দুলাল।
পঞ্চাশ লক্ষ টাকার চাঁদার দাবি
জাতীয় নির্বাচনের পরপরই পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নেয়। দুলাল প্রকাশ্যে কামরুজ্জামানের কাছে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করেন। অসহায় ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে শুরু হয় ধারাবাহিক হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মানসিক নির্যাতন। দুলাল তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে কামরুজ্জামানকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখাতে থাকেন। এলাকায় একধরনের আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়।
রাতের আঁধারে অফিসে হামলা
চলতি মাসের ৩ এপ্রিল দিবাগত রাতে ঘটে যায় সেই ভয়াবহ ঘটনা। দুলাল তার ৩০ থেকে ৩৫ জন সশস্ত্র সহযোগী নিয়ে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা হাতে সরাসরি হাজির হয় কামরাঙ্গীরচর থানাধীন পুরাতন বিদ্যুৎ অফিস গলিতে কামরুজ্জামানের অফিসে। উদ্দেশ্য একটাই— জোর করে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা আদায় করা।
কিন্তু সেই মুহূর্তে অফিসে কামরুজ্জামান না থাকায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে দুর্বৃত্তরা। তাঁর নাম ধরে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও অশ্লীল বাক্য ছুড়তে থাকে। তখন অফিসে উপস্থিত তিন সহকর্মী— মোঃ জাকির (৪৫), মোঃ সোহাগ (৩০) এবং মোঃ নজরুল (৪৬)— সাহস করে প্রতিবাদ করেন। আর তাতেই যেন আগুনে ঘি পড়ে।
নির্মম মারধর, কামড়ে ছিঁড়ে নেওয়া হলো মাংস
প্রতিবাদের জবাবে সন্ত্রাসীরা তিন কর্মীর ওপর পাশবিক কায়দায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। এলোপাথাড়ি কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে তাঁদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে নীলাফুলা জখম করা হয়। সবচেয়ে নৃশংস ঘটনাটি ঘটে সহকর্মী সোহাগের সঙ্গে— মূল আসামি দুলাল তাঁর ডান হাতে কামড় বসিয়ে মাংস তুলে নেন, যাতে ঝরতে থাকে তাজা রক্ত। মুহূর্তের মধ্যে অফিস পরিণত হয় রক্তের আখড়ায়।
আশপাশের মানুষের চিৎকার শুনে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে পালাতে বাধ্য হয় সন্ত্রাসীরা। তবে যাওয়ার আগে তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে যায়— এই ঘটনা নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি করলে কামরুজ্জামান ও তাঁর সহকর্মীদের হত্যা করে লাশ গুম করে দেওয়া হবে।
হাসপাতালে আহত তিন কর্মী
হামলার পর আহত তিন কর্মীকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর আহত সোহাগের অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবার ও সহকর্মীরা।
থানায় অভিযোগ দায়ের
ঘটনার পর ভয় ও আতঙ্কে দিন কাটাতে থাকেন কামরুজ্জামান। পরবর্তীতে আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করে সাহস সঞ্চয় করে তিনি কামরাঙ্গীরচর থানায় মূল আসামি আবু সাইদু হোসেন দুলালসহ অজ্ঞাতনামা ৩০-৩৫ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে চাঁদাবাজি, হামলা, গুরুতর জখম এবং প্রাণনাশের হুমকির বিষয়গুলো বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
এলাকায় ছড়িয়েছে আতঙ্ক
ঘটনাটি কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দুলাল দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আসছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা দ্রুত মূল আসামিসহ সকল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। কামরাঙ্গীরচর থানা পুলিশ অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *